প্রথম পর্ব
ভেবে ছিলাম, না গেলেও চলবে। ব্যাপারটাকে কোনো ভাবে পাশ কাটিয়ে সাইড করে দেব। কিন্তু বুঝিনি, সেই প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়বে নির্মম ভাবে। মানুষ নিজেকে মনে করে খুব চালাক। একটু বুদ্ধি খাটালেই হল, সব চলে আসবে হাতের মুঠোয়। কিন্তু বিধাতা সেখানেই পুচ করে হেসে ফেলেই দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। আর খচাখচ করে এলোপাথাড়ি কলম চালায়। লিখে ফেলে কিছু অদ্ভুত ঘটনা। আর আমরা তো নিরুপায়-সেই পথ ধরে এগোতে বাধ্য থাকি। রকেটের মত ভাবি, আমি নিজের নিয়মেই উড়ছি। আদপে তা নয়। ভগবান যে পেছনে আগুন গুঁজে দিয়েছে—তা ভুললে চলে নাকি! কিন্তু সব মন্দেও মুখবুজে মানিয়ে নেওয়ার মত কিছু ভালো দিক থাকে।শোনানোর মত কিছু গল্প অতীতেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতের জন্যে।আজ সেই অদ্ভুত গল্পটাই শোনাবো।
কলেজের ইউনিট টেস্ট। যদিও এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না। নোট করে বা বন্ধুর দেখে এত দিন যেমন বেঁচে গেছি, এবারেও ঠিক চালিয়ে নেব। ইঞ্জিনিয়ারিং বলে কথা।পরিক্ষার বৈতরণি উতরানোর এটাই নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য উপায়।
যখন আমি কলেজে পড়তাম, মাথার যে কী হয়েছিল জানি না। সামান্য ব্যাপারগুলোকে ঘটা করে ঘটাতেই ভালো লাগত। সাধারণত ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রথম ও দ্বিতীয় বছর হয় স্বপ্নের মতো। মন, প্রাণ, কল্পনা—মানে ত্রিভুবন অব্ধি ল্যাপ্টা-ল্যেপ্টি হয়ে থাকে গর্ব ও অহংকারে। ভয়ানক কিছু যেন ঘটতে চলেছে। আচার আচরন এমন, যেন স্পিড পোস্টে নোবেলটা এই এসে পড়ল বলে।মুখ গম্ভীর,ধীরে ধীরে কিথা বলা।মানে জৌলুশ যেন সব ফাঁক ফোকর দিয়ে ঠিকরে বেরত।
আমার এহেন অহংকার তখন তার পিক পয়েন্টে চলছে। সারাদিনে কত্ত চাপ! আধুনিক বুদ্ধি খাটিয়ে কলেজ বাঙ্ক করা, হোস্টেল সুপারের চোখ এড়িয়ে ছাদে বিয়ার নিয়ে বসা, বান্ধবীদের কাছে নিজের ইমেজকে সুনিপুণ কৌশলে বিল্ড-আপ করা আর মাথা খাটিয়ে তাসের চাল দেওয়া। এরপর আসে পড়াশোনার মতো ক্ষীণ ও হীন গোত্রের কিছু দায়িত্ব।নিয়ম রক্ষার্থে, আর কি। বাবা-মায়ের মুখের দিকেও তো তাকাতে হয়, নাকি? উফফ! সত্যি সত্যিই এক ভয়ানক জীবন।
যে গল্প নিয়ে আজ জামাইষষ্ঠীর আসন পাততে চলেছি, এ গল্প কিন্তু এখনকার নয়। আঙুল ঘষে ঘষে মোবাইল ঘাঁটার দিন তখনও আসেনি। টুক টুক টুক, ঠক ঠক করে মর্স কোড পাঠানোর মতো মেসেজ টাইপ করতে হতো। কুর্তি বা চুড়িদার ছিল মেয়েদের আদর্শ পরিধান। আর কেউ যদি জিন্স-টপ পরত—বাপরে বাপ, মডার্ন! এখনকার মতো কাটা-ফাটা, ছেঁড়াছিড়ির "ফকির-সভ্যতার"তখনও বিকাশ হয়নি।
পৃথিবীর তিন ভাগ জল বাদ দিয়ে এক ভাগ স্থলে দাপিয়ে বেড়াত পায়ে-টানা রিকশা। টোটো!কোথায় টোটো তখন।সে আবিষ্কারের যুগান্তকারী ফর্মুলাটি তখন ও মস্তিষ্কে জমিয়ে ঘুম দিচ্ছে। সব থেকে মজার ব্যাপার হলো, সিগারেট মাত্র তিন টাকা! ভাবা যায়? মাত্র তিনটাকা,আহারে!কেবল সাত টাকার বিনিময়ে এক বান্ডিল শ্রমিক বিড়িরও মালিকানা পাওয়া যেত।
হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক তখন কোথায়! আজকালকার অবহেলিত যে পাতি মোবাইল মেসেজিং সিস্টেম, তখন এটাই ছিল আমাদের কাছে ডেটোনেটর। সেন্ড বাটনটা কেবল টিপে দিলেই হলো। ব্যাস! মেয়েদের বুকে আঘাত হানত প্রেমের আত্মঘাতী বিস্ফোরণ।
আহা, কী দিনই না ছিল! তিন টাকায় সিগারেট—ভাবলেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এখনকার হাল দেখ! সিগারেট কিনতে গেলেও লোকসভার বাজেটের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। যতসব!
ঘটনাটার সূত্রপাত রাতে। একাগ্রতার সঙ্গে মুখে বিড়ি গুঁজে বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলছি। এমন সময় ফোন এল। ফোন করেছে আমার মাসির মেয়ে পুটু। আমার চেয়ে কয়েক মাসের ছোট। মাসের তফাতে দাদা-বোন হলেও আমরা খুব ভালো বন্ধু। মনের কথাবার্তা, ইয়ার্কি-ফাজলামির আদান-প্রদান বেশ ভালোই হয়। ফোন তুলতেই আকস্মিকভাবে কিছু অভিযোগ তীরের মতো ছুটে এল আমার দিকে।
—দাদারে, তুই আসবি না?
আসলে কয়েক দিন পর ওর বিয়ে। মা জানিয়ে ছিল। যাওয়া যে সম্ভব হবে না, সে তথ্য আগেই সরবরাহ করেছিলাম। পুটু মনে হয় সূত্র মারফত খবর পেয়েছে।
বিয়েতে যাওয়া অসম্ভব। কলেজে ইউনিট টেস্ট চলছে। যদিও সেটা এমন কিছু ইম্পর্ট্যান্ট না। জীবনে কত পরীক্ষাই না এল-গেল! তবে আসল ঘটনা অন্য। এক বান্ধবীর জন্মদিন চেপে গেছে ঠিক ওর বিয়ের দিনেই। নিছক বান্ধবী হলে এত ভাবনা ছিল না। যাহোক করে নিজেকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করিয়ে নিতাম। পা চালিয়ে দিতাম বিয়েবাড়ির উদ্দেশে।
কিন্তু উড়ো খবর, উক্ত বান্ধবী নাকি এই শর্মার প্রেমে পড়েছে। শুধু কি তাই! জন্মদিন পালনের নেপথ্যে প্রেমপ্রস্তাবেরও সুযোগ আছে। বন্ধুমহলে কানাঘুষো চলছে।এ তো পরম পাওনা! বিগত তিন মাস ধরে যে চিকেনকে মেরিনেট করলাম, কূটনৈতিক চাল দিয়ে অল্প আঁচে ধৈর্য ধরে কষালাম, এখন কষা হতে তেল ছাড়তে শুরু করেছে। আদা-রসুনের প্রাণঘাতী গন্ধ আকাশ-বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় পেট খারাপ হলে চলে?
পল্লবীর মন ছিল এলোমেলো। তাকে বাঁকিয়ে আমার দিকে আনতে কী করিনি আমি! দিনের পর দিন দামী রেস্টুরেন্টে চাউমিন, বিরিয়ানি, মোগলাই, মোমো—ঝড়ের মতো উড়িয়েছি। সেও ছোট পেটে চেটে-পুটে খেয়েছে নির্মমভাবে। আজ আমার সংযম ও সাধনার ফল পাকতে চলেছে। ফিশ টোপ গিলিং, আর আমি বড়শি ছেড়ে বিয়েবাড়ি পালাইং! এ হয় নাকি?
তাই মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম, পুটুর বিয়েটা আমাকে বলিদানের খাতায় রাখতেই হবে। কিন্তু মানুষের ক্ষমতা বড় সীমাবদ্ধ হে। ওই যে আগে বলেছিলাম না—বিধাতা! ব্যাটা সব সময় কলম নিয়ে কান খোঁটাচ্ছে আর ভাবছে, "এবার কী করলে বাছাধন জব্দ হবে?"
ফোনের এপাশ থেকে অসম্মতি জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। মানে ইউনিট টেস্টের ‘ইউ’ অবধি কেবল উচ্চারণের সুযোগ পেলাম মাত্র। সে কী কান্না, উফ! এমন কাঁদতে কাঁদতে যদি ইংরেজদের কাছে কেউ ভারত চাইত, তারাও ফোঁপাতে ফোঁপাতে ভারত হাতে তুলে দিত।
আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পাছে কান্না থামাতে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর তাড়াহুড়োয় চপ্পল পরে পৃথিবীতে পদার্পণ করতে বাধ্য হন! এই ধরনের কান্নাকে বলে সিস্টেমেটিক সিঙ্ক্রোনাইজেশন। সব ধাপই একদম নিখুঁত ও পরিমাপমতো। কী নেই মেনুতে—হাপুস, ফোঁপানি, ছলছল, বুকফাটা; মানে প্রতি ধাপেই চমক।
আমি পড়লাম বিপাকে। একদিকে লাস্যময়ী বান্ধবীর হাতছানি, অন্যদিকে পুটুর ফোঁপানি। এবার কী করা যায়! এই ভেবে ভেবেই তাস উঠল মাথায়। হবু প্রেমের সমাপ্তি কি সৃষ্টির আগেই ঘটবে? এত হিউজ ইনভেস্টমেন্ট কি অবশেষে লস প্রজেক্টে পরিণত হবে?
এক প্লেট চিকেন চাউমিন চল্লিশ টাকা, বিরিয়ানি সত্তর, শেষে কোল্ড ড্রিংক। কত দিন ধরে চালিয়ে গেছি এসব। পকেটে টান ধরেছে—ধার করেছি। বন্ধুদের গ্রাফিক্স এঁকে এঁকে টাকা কামিয়েছি। বই কিনতে হবে—এই ধরনের ধাপ্পা দিয়ে মায়ের থেকে টাকা ঝেড়েছি। কষ্টের কথা কী বলব! 'থিওরি অব মেশিন' বইটা এখনো কেনা হয়নি। পিডিএফ পড়ে চালাতে হচ্ছে। বইটা গেছে সম্ভবত মোগলাইতে।পুরুষ মানুষ হওয়া কি সামান্য ব্যাপার! সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় এসেই সবাই আটকে যায়।
তাস ফেলতে দেরি করছি বলে বন্ধুরা সামান্য বিরক্ত, আর কিছুটা অবাক। ফোনের ওপাড়ে কেউ কাঁদছে। আবার মেয়েমানুষ।
—পুটু, কাঁদিস না। আমি দেখছি।
এই বলে ম্যানেজ দেওয়ার একটা দুর্বল চেষ্টা করলাম। কিন্তু কী মেয়েরে বাবা! কান্না তো থামলই না, বরং অতীত নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া শুরু হল।
ছেলেবেলায় আমি মামাবাড়ি এসেছি শুনলেই সব ছেড়ে নাকি ও হাজির হত। কাশফুলের বাগানে শীতের মিঠে রোদে মাদুর পেতে শুয়ে শুয়ে ওর বিয়ে নিয়ে কত কী আলোচনা করতাম। ও ঝাল ঝাল তেঁতুলের আচার বানাত। দুজনে পুকুরপাড়ে বসে মজা করে খেতাম। মামাবাড়ি গিয়ে নৌকা চালিয়ে আখ পাড়তে যেতাম। গাছে উঠে পাকা আম পেড়ে খেতাম।
এহেন অতীত দিয়ে আমাকে ধরাশায়ী করতে চাইছে ও। এসব মেয়েদের রণকৌশল।
আমার নাজেহাল অবস্থা। একদিকে প্রেম-প্রহেলিকার হাতছানি, অন্যদিকে আত্মার আত্মীয়তার আন্তরিক আহ্বান।
পুটু অবশ্য ভুল কিছু বলেনি। ছেলেবেলা থেকে মামাবাড়ি আমার কাছে স্বপ্নের মতো। নদীর বুক চিরে নৌকা করে যেতে হত মামাবাড়ি। বন-জঙ্গল, ফলের বাগান, ধানক্ষেত দিয়ে মোড়া চারপাশ। পুকুরভর্তি মাছ, খামারভর্তি হাঁস-মুরগি। উফ! সেই দেশি ডিম। এখনও ভাবলে লোভ হয়।
কিন্তু সে তো অতীত। পুটু এখন সেই অতীত দিয়েই আমার বর্তমানকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে নরম করতে চাইছে। আরে, এত খাটাখাটনি করতে হত না। যদি পল্লবী নামক প্রবলেমটা মাথাচাড়া দিয়ে না উঠত, আমার কি যেতে ইচ্ছে করছে না? অবশ্যই করছে।
বিয়ে-টিয়ে পরে। রাত জেগে বিয়ে দেখার মতো বিষয়ে আমার আগ্রহ কিছুটা কম। তবে খাসি, দই-কাতলা—এসবের অমোঘ টান কি হুট করে এড়ানো যায়?
এ তো গেল পয়সার এক পিঠ। অন্য পিঠের মোহ-মায়া আরও টানটান। অশোকস্তম্ভের মতো হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে সেখানে এক জোড়া প্রেমভরা ভাসা-ভাসা চোখ। একটা সম্পর্কের সূত্রপাত। তার জন্য খাসির বলিদান আমি দিতেই পারি।
তবে পুটুকে এড়ানো যাচ্ছে না আপাতত।
এমন সময় টুক করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। যেই টুক করে বুদ্ধিটা এল, অমনি পুট করে ফোনটা কেটে দিয়ে সুইচ অফ করে দিলাম। পুটুর কান্না উচ্চমার্গে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল।
তবে জানি, বিপদ এখনও পিছু হটেনি। পুটু এবার বাবাকে ফোন করবে। বাবা সটান আদেশ জারি করবে। আর সেই আদেশে আমার প্রেম পেছন তুলে পালাবে।
ও আমার দুর্বল জায়গাটা বেশ ভালোভাবেই জানে। বাবাকে আমি ভয় পাই। এখনও গম্ভীর গলায় হাঁক ছাড়লে মূত্রনালিতে টান ধরে। যম যদি কোনো দিন সামনে এসে দাঁড়ায়, 'চল, ফোট তো' বলে কাটিয়ে দিতে পারব। কিন্তু বাবা! মানে পিতৃদেব, মানে জনক... বাঁচাও হে প্রভু!
ফোন বন্ধ করে বিছানায় ফেলে দিলাম। বাম হাতে হাতপাখার মতো করে তাস ধরা ছিল। বন্ধুরা মুখে বিড়ি গুঁজে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিপদ কিছু একটা ঘটেছে, ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে তারা। অগত্যা সব খুলে বললাম। এরপর অগ্নি-৫-এর মতো বাবা নামক ক্ষেপণাস্ত্র যে আমার ওপর আছড়ে পড়বে, তাও জানাতে ভুললাম না।
আলোচনা শুরু হল। বিচার, বিবেচনা, পর্যালোচনাও চলতে লাগল। বিচারের রায় প্রতিবারই ঝুঁকে গেল পল্লবীর দিকে। তাদের মতে, মেয়েরা জন্মায় কাঁদারই জন্য। সে কান্নার গুরুত্ব পচা ডিমের মতো—জলে ফেললেই ভেসে ওঠে। মাসির মেয়ে হয়তো রেগে যাবে। কিন্তু পরে একটু তেলালেই সে রাগ ভ্যানিস।
কিন্তু এ বাজারে যদি একবার প্রেম হাতছাড়া হয়, তা হলে আগামী কলেজ-জীবন একদম নিরামিষ। হুম... যুক্তি মনে ধরার মতো। তাছাড়া পরীক্ষা আছে—এমন একটা বাঙ্কারে শেল্টার নিয়ে বাবা নামক বিপদ থেকেও বাঁচা যেতে পারে।
সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। আনন্দে আরেক পশলা বিড়ি ধরিয়ে টানাও শুরু করে দিলাম।
ভোলা এতক্ষণ চুপ ছিল। আমাদের আলোচনায় কোনো রকম শব্দ নষ্ট করেনি। সব যখন মিটমাট ঠিকঠাক , তখনই সে মুখ খুলল।
—প্রেমের জন্য বোনটার বিয়েতে যাবি না? ছিঃ! এটা কি ভালো দেখায়? কীভাবে কাঁদছে মেয়েটা!
—আরে, এদিকটা সামলে নিই আগে। তারপর ওর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ক্ষমা-টমা চেয়ে আসব। ব্যাস, ঝামেলা মিটে যাবে।
—বোনটাকে আজ ঝামেলা লাগছে না?
আমি চুপ। কিছু প্রশ্ন থাকে, যার উত্তর দিতে নেই।
বিড়িতে এক লম্বা টান দিয়ে গম্ভীরভাবে ভোলা বলল,
—বিয়ে কবে?
—শনিবার।
—আজ তো হয়ে গেল মঙ্গলবার। হুম...
নাক দিয়ে ভারি নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে আরও গম্ভীরভাবে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল ভোলা। প্রথমে রুমের এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত কয়েকবার হাঁটল। ডান হাত মুঠো করে বাঁ হাতের তালুতে কয়েকটা ঘুষিও চালাল। নোট গুনতে গুনতে সংখ্যা ভুলে গেলে লোকে যেমন শূন্য দৃষ্টিতে তাকায়, তেমনি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল ভোলা।
কিছুক্ষণ পর হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। নর্দমার মতো স্তুপ করে রাখা বইয়ের পাহাড়। ঝুল-ধুলো-মাখা সেই বইয়ের গোডাউনে সটান হাত চালিয়ে দিল সে। একটা ডায়েরি বের করে আনল। তারপর এদিক-ওদিক অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নিচে ঢুকে একটা পেনও উদ্ধার করে ফেলল।
এরপর ফিরে এসে খাটের ধারে রাখা চেয়ারে আবার বসল। ডায়েরির পাতা খুলে কী সব লিখে যেতে লাগল তাতে। মুখ অসম্ভব গম্ভীর। ভ্রু কুঁচকে উঠেছে। চোখে-কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ। ইতিমধ্যেই বিড়িটা নিভে গেছে।
আমি আড়চোখে ডায়েরির দিকে তাকালাম। দিন, তারিখ, দূরত্ব মিলিয়ে একটা জটিল অঙ্ক চলছে।
কিছুক্ষণ পর ভোলার মুখে হাসির এক ঝিলিক খেলে গেল। নেভা বিড়িটা খানিক টানাটানি করে ব্যর্থ হয়ে আবার আগুন ধরাল। পাখার দিকে তাকিয়ে এক জমাট মেঘের মতো ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর আমাকে বলল,
—চল! সমাধান হয়ে গেছে। সব দিক সামলে নিতে পারবি।
আমি বললাম,
—মানে?
—মানে আবার কী! রথ দেখা আর পথ চেনা—দুই-ই হয়ে যাবে।
—পথ চেনা না, কলা বেচা।
—যেখানে যা মানায়। তুই কি আর রথ দেখতে গিয়ে কলা বেচবি, না কোনো সুন্দরী মেয়েকে দেখে তার বাড়ির পথ চিনবি?
—পথ চিনব! পথ চিনব!
আমি আত্মহারা উৎসাহ নিয়ে বললাম।
—জানতাম। তাই ঠাকুর ভেদে মন্ত্র উচ্চারণ।
—সে ঠিক আছে। মন্ত্র-তন্ত্র মেখে তুই তান্ত্রিক হয়ে গে। কিন্তু উপায়টা কী বের করলি, সেটাই তো বল।
ডায়েরির দিকে তাকাল ভোলা। হাতের নিভু-নিভু বিড়িতে টান দিয়ে তাকে আবার উজ্জীবিত করল। একটা ভয়ানক রহস্য যেন উন্মোচিত হতে চলেছে।
—দেখ, তোর মাসির মেয়ের বিয়ে শনিবার। আবার আমাদের ইউনিট টেস্টও শেষ হচ্ছে শনিবার। আর তোর পল্লবীর জন্মদিনও শনিবার। শনিদেবতা তিন দিক দিয়ে আক্রমণ শানিয়েছে তোকে। তাই এক কাজ কর। পরীক্ষা দিয়ে বিকেলের ট্রেনে বেরিয়ে যা। বিয়েটা অ্যাটেন্ড কর।
আমার মুখ বেঁকে গেল। কয়েকজন তো ফ্যাচ করে হেসেও দিল।
এই প্ল্যান! ধুস!
আমি বললাম,
—দারুণ!দারুন! দারুণ প্ল্যান তো তোর! আমি শনিবার বিয়েবাড়ি চলে যাই, আর তুই ফুটের মাল লুটে নে!লোক অজান্তের বাঁশ দেয়।তুইতো চোখে চোখ রেখে দিচ্ছিস।ব্রেভো!
ভোলা কিছুটা যেন বিরক্ত হল।
—আরে, পুরোটা তো শুনবি। তোর পল্লবী-রাধাবল্লভী চেখে দেখার ইচ্ছে আমার নেই। না, মানছি পল্লবী দেখতে মন্দ না। মানে, ভালোর দিকেই। কাঁচা সোনার মতো গায়ের রং। কাশ্মীরি পশমের মতো ফিনফিনে চুল। রক্তকরবীর মতো লাল লাল ঠোঁট। ধনেপাতা... না না না, ধনেপাতা না,ধনেপাতা না... পানপাতার মতো মুখ। চিবুকে একটা তিল আছে, দেখেছিস? কী মায়াবী লাগে যখন হাঁসে!মনে হয় যুগযুগান্ত তাকিয়ে থাকি।
ভোলা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
আমি মনের ভেতরে অনুসন্ধান চালালাম।চিবুকের নিচে তিল আছে নাকি? কই আমার তো চোখে পড়েনি। আচ্ছা!ভোলারে ভোলা।তোর মনের ভেতরে আছে পল্লবীর ছবি তোলা।
আমি তাকিয়ে আছি ভোলার দিকে। কল্পনা থেকে তড়িঘড়ি বাস্তবে ফিরে এসে ও আবার বলল,
—ভাই, পল্লবীর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। আমি হলাম গিয়ে সাধু প্রজাতির মানুষ। আর সব থেকে বড় কথা, ইনভেস্টমেন্ট যখন তোর, প্রফিটও তুই নিবি। শালা, যেচে না কারও সাহায্য করতে নেই!
মনে মনে ভাবলাম, ধনেপাতা, তাই না! ঝামেলাটা আগে মিটুক। তারপর তোকে দেখছি। ধনেপাতার নৌকো করে ভাসিয়ে দেব গুয়ে। উপরে পাবলিক টয়লেট বসাব। শালা, খাবি শুয়ে শুয়ে।
আমার পল্লবীর দিকে নজর!
মনের রাগ মনেই চালান করে তেলালাম ওকে।
—আরে বন্ধু, ইয়ার্কিও বুঝিস না! আমি তো মশকরা করছিলাম। এই দেখ, ছেলে আমার রেগে প্ল্যানে দিল হেগে। আচ্ছা বল তো, এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করার মতো বুদ্ধি তোর ছাড়া আর কার আছে?
সে খানিক খুশিই হল। বিড়িতে আবার টান দিয়ে বলল,
—থাক, আর বাটার মাখাতে হবে না। যা বলছি, চুপচাপ করে যা।
আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে শোনার ভঙ্গি করলাম। ভোলা ডায়েরির দিকে তাকাল।
—জন্মদিনের পার্টিটা বরং আমরা রবিবার করব।
—ও রাজি হবে?
—না হওয়ার কী আছে?
—রাজি যদি না হয়, তা হলে কী করবি?
—আগে বলে তো দেখ। তবে হ্যাঁ, শনিবার যত রাত পর্যন্তই জাগিস না কেন, রবিবার কিন্তু সক্কাল-সক্কাল বেরোতে হবে। তা হলে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাবি হোস্টেলে। খানিক রেস্ট নিলেই হল। ত্বকের ক্লান্তি-টান্তিও কেটে যাবে। আর আমরা সবাই মিলে যদি রবিবার ঠিক করি, ও রাজি না হয়ে যাবে কোথায়!
আনন্দে চোখে জল আসার জোগাড়। এই না হলে বন্ধু! পাবলিক টয়লেট আপাতত মুলতবি করলাম।
ভোলা আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
—এই, তোকে জন্মদিনের নেমন্তন্ন করেছে তো?
এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকালাম। যার মানে দাঁড়ায়—না।
সত্যিই তো! আমাকে এখনও ডাকেনি পল্লবী।
একটা ফিচেল-মার্কা হাসি বেরোল ভোলার মুখ থেকে।
—ডাকবে তো?
তাই তো!
চিন্তার একটা ভাঁজ পড়ল আমার কপালে।
ভোলা ফোনটা বের করল। সটান লাগিয়ে দিল পল্লবীকে। আমি কান এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ঠেকালাম ফোনের পেছনে। একে একা ছাড়া যাবে না। জাঙিয়া যেমন পেছনে লেপ্টে থাকে, তেমনি চোখে চোখে রাখতে হবে ব্যাটাকে।
দুটো কি তিনটে রিং হতেই পল্লবীর গলা ভেসে এল।
—বল।
ভোলা বলল,
—বলব কী আর! শুনলাম, অর্পণ নাকি বাদ পড়ছে তোর জন্মদিনের পার্টি থেকে?
—কে বলল?
—শুনলাম।
—দেখতে পাবি।
আমার মুখের হাসি চওড়া হল। কেমন আঠালো গলা পল্লবীর! কী মিষ্টি। কী সুন্দর।নিকুচি মেরেছে বিয়েবাড়ির! বাবার আদেশ আমি মানি না। এই প্রাপ্তির কাছে সবকিছুই তুচ্ছ। খাসি-বাসি হয়ে উড়ে যাক।
লোভ... জীবনের প্রধান লক্ষ্যগুলো এই লোভের পাপেই পদপিষ্ট হয়। না না, লোভকে পরিত্যাগ করতেই হবে। তেমন হলে রবিবার না, শনিবারই হবে জন্মদিন।
হুট করে মনে পড়ল—বিয়েবাড়ির রান্না করবে বাবা। দারুন খাসির হাত। সব প্ল্যান যখন রেডি, তখন বাঁধ সাধার কী আছে!
আর টাকা-পয়সার লোভ তো করছি না। একটু না হয় খাসি, কিংবা ভেটকি পাতুরির লোভেই পড়েছি। এ পাপ গায়ে লাগে না। বিড়ির ধোঁয়ার মতো উড়ে চলে যায়।
ভোলা আবার বলল পল্লবীকে,
—তবে পার্টিটা রবিবার কর না।
—কেন?
—আরে বলিস না। শনিবার মন খারাপ থাকবে। আমার হলে মানিয়ে নিতাম। কিন্তু আমাদের গ্রুপের সবারই মন খারাপ হবে সেদিন।
—হায়! কেন?
—আরে বলিস না। ওই দিন মেটেরিয়াল সায়েন্সের পরীক্ষা আছে। পড়া তো দূরের কথা, কেউ বইই কিনিনি। খারাপ পরীক্ষা দিয়ে মন ভালো হয় নাকি?
—আমাদেরও কি একটা পরীক্ষা আছে। এখন পর্যন্ত জানিই না। দেড় ঘণ্টা খাতা-কলম নিয়ে কাটাব কী করে, বল তো?
—দেখলি তো! পরীক্ষা নামক অশুভ দিনে শুভ কাজ করাটা কি ঠিক হবে?
—খারাপ বলিসনি কিন্তু। ঠিক আছে, রবিবার ফাইনাল। ওই অর্পণটা কোথায় রে? ফোন করছিলাম, সুইচ অফ করে রেখেছে।
—কে জানে! গাঁজা-টাঁজা টেনে কোথাও পড়ে আছে বোধহয়।
সবাই নিঃশব্দে হেসে উঠল। আমি কটমট করে তাকালাম ভোলার দিকে।
পল্লবী ধমক দিয়ে বলে উঠল,
—অর্পণ গাঁজা টানে না। বেশি ভাট বকিস না। আমি ওকে ভালোভাবেই চিনি। চল, রাখছি। রবিবার কিন্তু।
ফোন রেখে অসীম তাকাল আমার দিকে।
গর্বে তখন আমার বুক, পেট, কিডনি পর্যন্ত ফুলে উঠেছে। যাক, সমাধান হল তাহলে।
এবার ফোনটা খুলে পুটুকে জানিয়ে দিই। যাচ্ছি আমি।
দ্বিতীয় পর্ব
মাথা কি এমনি এমনি গরম হয় কারও? সব যখন একদম ঠিকঠাক, তখনই বিপদ কোথা থেকে এসে টুক করে চোখ মেরে দেয়।
সবকিছুই তো ঠিকঠাকই ছিল। পরীক্ষা নামক পাপটা বিদেয় হবে দুপুর দুটো তিরিশে। তারপর পদব্রজে পাড়ি দেব হোস্টেলের উদ্দেশে। কলেজ-লাগোয়া হোস্টেল। জয় করতে লাগবে খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট। রুমে এসে ইউনিফর্মটা কলার ছালের মতো ছাড়িয়ে নেব। তারপর সদ্য কেনা জিন্স আর টি-শার্ট চাপিয়ে রওনা দেব স্টেশনে। ট্রেনের টাইম চারটে বেজে চোদ্দ মিনিট। এক মিনিট আগেও না, আর পরেও না।
কিন্তু ওই বললাম না, ভাগ্যদেবী! আমাদের ভাগ্য নিয়ে অলওয়েজ জাগলিং করে চলেছেন। আগেই বলেছি, পরীক্ষা-টরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বা ভয় তেমন কিছু নেই। সে বাসনা অনেক আগেই আমাদের শরীর ছেড়ে বিদায় নিয়েছে। প্রশ্ন কঠিন আসবে না সহজ—এসব সাংসারিক মোহমায়া বহু কাল আগেই ত্যাগ হয়ে গেছে। কেবল প্রশ্নের মানেটা উদ্ধার করতে পারলেই হলো। ভগবান কল্পনাশক্তি তো এমনি এমনি গেঁথে দেননি। প্রশ্ন থাকে উত্তর পাওয়ার জন্য, আর উত্তর দিতে আমরা বরাবরই মরিয়া।
পরীক্ষার হলে ঢুকতে গিয়েই বাঁধা পড়ল। সবাইকে নাকি আগে সেমিনার হলে যেতে হবে। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা জীবনানন্দ ঘোষবাবু নাকি সবাইকে ডেকেছেন এবং কিছু কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।e
মনের মধ্যে ভয়-মেশানো আনন্দ খেলে গেল। সেমিনার হলের দিকে পা বাড়ালাম। আতঙ্কের মূল কারণ হলো মাইক্রোফোন। এ বস্তুটি হাতে পেলেই ভদ্রলোক বক্তৃতা-সাম্রাজ্যের ছত্রপতি হয়ে যান। কত রকমের যে বক্তব্য ডায়রিয়ার রোগীর মতো তরল হয়ে অনবরত ঝরে পড়ে! পাতাল থেকে স্বর্গলোক অব্ধি—হেন টপিক নেই, যা উনি কভার করেন না। তবে সেমিনারের শেষে ভালোই খাওয়ান। এটাই হলো সব হারিয়ে ঘুমসি খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দের ব্যাপার।
সেমিনার হলে ঢুকেই দেখি, গদার মতো মাইক হাতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ভদ্রলোক। চোখ বন্ধ। ধ্যানমগ্ন ফেজ চলছে। আজ কোন কোন টপিকে থাবা মারবেন, তারই ব্লুপ্রিন্ট বানাচ্ছেন মনে হয়। পরে জানলাম, উনার মা কিছু দিন আগে মারা গেছেন। সেই উপলক্ষেই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সভা।
সেমিনার হলে বসে একটা জোর নিশ্বাস নিলাম। না! খাওয়ারের কোনো গন্ধই নেই! খাওয়াবেন না মনে হচ্ছে। মন খারাপ হয়ে গেল। শ্রদ্ধা না হয় জ্ঞাপন করলাম, কিন্তু ভক্তিটাই তো আসছে না।
লুকিয়ে হল ছেড়ে পালাব? গদা হাতে গদাধর দু-ঘণ্টার আগে রেহাই দেবেন না। এ আমার পূর্ব-অভিজ্ঞতা।
জীবনানন্দবাবু ঝাড়া দেড় ঘণ্টা অনেক কিছুই বলে চললেন উনার মাকে নিয়ে। কথাগুলো কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুনছিলাম না। তিরানব্বই বছরের বুড়ি মরেছে। তাকে নিয়ে এত আদিখ্যেতার কী আছে! এই রকম এক বাচালের জন্ম দিয়েছেন—ব্যাস, যথেষ্ট হয়েছে!
বুড়ির জীবনবৃত্তান্ত শুনে ফালতু সময় অপচয় করার মতো ছেলে আমি নই। সময় খুব মূল্যবান। একে মেপে, ভেবে, বুঝে খরচ করতে হয়। তাই আমি পল্লবীতে মনোনিবেশ করলাম। আমার সামনেই বসেছে সে। তার গা থেকে ভুরভুরে একটা ফুলের গন্ধ উড়ে আসছে। ঢেউয়ের মতো তালগোল পাকিয়ে লুটিয়ে পড়ছে আমার চরে। এলোমেলো করে যাচ্ছে আমার হৃদয়টাকে। একমাত্র লক্ষ্য এখন ও। কোথায় আমার কুড়ি বছরের কাব্যের মতো সুন্দরী পল্লবী, আর কোথায় ওই ঘাটের মড়া তিরানব্বই বছরের বুড়ি! ঘরের মড়াকে শ্মশানে পাচার করে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ঢাক পিটিয়ে কলেজ প্রচারের কী প্রয়োজন? বুঝি না বাবা।
আমি একমনে পল্লবীকে দেখছিলাম। ঠিক দেখছিলাম না, হারিয়ে গিয়েছিলাম ওর মধ্যে। হঠাৎ এক হুঙ্কারে চমকে উঠলাম। ভদ্রলোক টেবিলে জোরে এক ঘুষি মেরেছেন। ইরান আর আমেরিকার যুদ্ধে বেজায় চটে আছেন মনে হয়। মায়ের মৃত্যুতে ইরানের কী দোষ, আর আমেরিকাই-বা কী করে ফেলেছে! আমি ইরানের পক্ষেও নই, আমেরিকার পক্ষেও নই। আমি পল্লবীর পক্ষে। তাই আবার পল্লবীতেই হারিয়ে গেলাম।
কিছু সময় হারিয়ে ছিলাম। যখন বাস্তবে ফিরলাম, দেখি ভদ্রলোক বয়লার মুরগির অপকারিতা নিয়ে কথা বলছেন। জানালা দিয়ে বাতাস বইছে। পল্লবীর চুলগুলো উড়ে এসে আমার গায়ে লাগছে। সে মুখ টিপে হাসছে। ভোলা তো ঠিকই বলেছিল। একটা তিলেরও দেখা পাচ্ছি। আহা, কী চমৎকার লাগছে ওকে!
ভাগ্যিস বক্তৃতায় মন দিইনি। নইলে বক্তার জ্ঞানের ঠেলায় অজ্ঞান হয়ে যেতাম। আজ মোটামুটি সব বিষয় নিয়েই চর্চা করেছেন। তার মধ্যে সতীদাহ প্রথা, সৌরভ গাঙ্গুলি আর গ্রেগ চ্যাপেল—প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মাঝখান থেকে পরীক্ষা দু-ঘণ্টা ডিলে হয়ে গেল। বুড়ি গেল তো গেল, সঙ্গে আমাকেও বিপদে ফেলে দিল। যতসব!
ক্লান্ত ও ভগ্ন মনে সেমিনার হল থেকে বেরলাম।পরিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছে শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।জ্ঞানের ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে আজ।ভাগ্যিস পল্লবী ছিলো।নইলে সেমিনার হল থেকেই সোজা পাগলা গারদে চলে যেতাম।
তৃতীয় পর্ব
পরীক্ষার হলে- সামনে, পেছনে, ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে যখন বুঝলাম বাকিদের অবস্থাও ঠিক আমার মতো, তখন নিশ্চিন্ত হয়ে উপরে তাকালাম। আহা, কী শোভা! পাখা ঘুরছে, টিকটিকি এ দেওয়াল থেকে ও দেওয়ালে লেজ দুলিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, টিউবলাইট জ্বলছে। দেখতে কিন্তু দারুণ লাগছে। সামান্য একটা টিকটিকির চলাফেরা যে মনের মধ্যে এমন পুলক আনতে পারে, ভাবতেই পারছি না।
এমনভাবে কোনোমতে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলেই হবে। তারপর সটান সাদা খাতা জমা দিয়ে বীরের মতো রুম ছাড়ব।
সত্যি বলতে কী, পরীক্ষার খাতায় যাহোক কিছু একটা আবিষ্কার করে লিখব—সে ইচ্ছে যে একেবারেই লুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়। আমার মধ্যে একটা গুণ আছে—বানানোর গুণ। অনেক ক্ষেত্রেই তা কাজেও লেগে যায়। প্রশ্ন দেখলে কিছু না কিছু একটা উত্তর ঢেকুরের মতো জোর করে বেরিয়ে আসতে চায়। তবে আজ তারও উপায় নেই। হাতে-পায়ে ধরে হার মেনেছি। অবশেষে ডিম-ম্যাগির লোভ দেখাতে হল। বিনিময়ে একটা পেন জোগাড় হলো বটে, কিন্তু খাতায় নাম আর রোল নম্বর লিখতে না লিখতেই তার জীবনের অবসান হলো।
তাই প্রশ্ন দেখে উত্তর লেখার ইচ্ছেগুলোকে আপাতত দমিয়ে রেখেছি। মৃত পেন আর উন্মুক্ত প্রান্তরের মতো সাদা খাতা মেলে বসে আছি। বসে থাকতে থাকতে কেমন একটা ঢুলুনি ভাবও চলে এসেছে। প্রকৃতির শোভা একটা সময় পর্যন্ত ভালো লাগে। তারপর সেগুলোও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে।
বোধহয় এক ঢুলুনি মেরে দিয়েছিলাম। হঠাৎ দেখি, এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। আর কী চাই! রাজার মতো নিজের আসন ছেড়ে সটান গেলাম শত্রুশিবিরে। নাম আর অর্ধেক রোল নম্বর লেখা সাদা খাতাটা তরবারির মতো হাতে ধরা। অস্ত্র সমর্পণ করে সটান রুমের বাইরে। স্যার পেছন থেকে কিছু বলছিলেন। কিন্তু উদ্দেশ্য যখন অনেক বড়, তখন পেছনের কথাকে অগ্রাহ্য করতেই হয়।
রুমে এসে বুঝলাম, সময় একদম শিখরে। ব্যাগটা আগের রাতেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। বিষ্ণুপুর-খ্যাত খাদির শেরওয়ানি, নাগরাই জুতো, গামছা, সোনির হ্যান্ডিক্যাম—সবকিছু পেটে গুঁজে হালকা ভুঁড়ি বাগিয়ে বিছানায় পড়ে আছে। হাতঘড়িতে দেখলাম, তিনটে বেজে দশ। জিন্স পরারও সময় নেই। এই মুহূর্তেই বেরোতে হবে। নইলে ট্রেন আমাকে ফেলে চলে যাবে।
কোনো কথা না ভেবেই কলেজ ইউনিফর্মের ভরসায় ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুট লাগালাম। রিকশা ধরে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। আবার রিকশা ধরতে হবে। সব যন্ত্রণা শেষ করে যখন স্টেশনে পৌঁছালাম, ততক্ষণে ট্রেন চলে এসেছে। জীবনের বাজি রেখেই ওভারব্রিজ পেরিয়ে কোনোমতে ছাড়ন্ত ট্রেনে পড়ন্ত পা দিলাম।
কিন্তু ও হরি! এ তো লেডিস কামরা।
ট্রেন ততক্ষণে গতি ধরেছে। মেয়েগুলো আমাকে দেখছে যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী। কিছু আমার লেভেলের মেয়ে আছে বটে। বাদবাকি প্রায় সবাই মধ্যবয়স্কা।
ভগবান মনে হয় হিসেব-নিকেশ খুব একটা বোঝেন না। কারণ যেটা যাকে দেন, তাকে সেটা মানায় না। আমার লেভেলের যে মেয়েগুলো আছে, আমার উপস্থিতিতে তাদের কোনো সমস্যা নেই। বরং গতানুগতিকতার বাইরে কিছু একটা ঘটেছে বলে বেশ মজাই পাচ্ছে। আর যারা রেগে ফুঁসফাঁস করছেন, তাদের এসবের কোনো প্রয়োজনই নেই। ইচ্ছে করলে ঢিপ করে প্রণাম করা যায়।
তাদের দৃষ্টিটাও অদ্ভুত। এমনভাবে তাকাচ্ছেন, যেন আমি একেবারে বাউন্ডুলে, ফোর-টুয়েন্টি গোছের লোক। বেশি সাহস না দেখিয়ে দরজার কাছেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম।
ভেতরে মারাত্মক দেখতে কয়েকজন তরুণীও আছে। মাঝেমধ্যে চিরুনি বের করে দিব্যি চুল আঁচড়ে নিচ্ছে। আর আমি? প্রাণ হাতে নিয়ে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছি।
পরের স্টেশনে ট্রেন থামল। কী বলব, নামতে একদমই ইচ্ছে নেই। মনকে বোঝালাম—এই পৃথিবী তার নিজের নিয়মেই চলে। এখানে ব্যক্তিগত ইচ্ছে-অনিচ্ছের খুব একটা দাম নেই। মরার ইচ্ছে না থাকলেও তো মরতে হয়, নাকি!
অগত্যা পাশের কামরায় উঠে পড়লাম। ফাঁকাই ছিল। জানালার ধারে একটা সিটও পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়বে ছাড়বে করছে, এমন সময় একটা মেয়ে উঠে এসে আমার সামনেই বসল। আজ ভাগ্যের চাকা যেন বন বন করে ঘুরছে।
মেয়েটির পরনে নীল জিন্স আর লাল গেঞ্জি। সে যুগের আধুনিক পরিধান। আমার থেকে বয়সে বড়ই হবে—এমনটাই অনুমান করলাম। কারণ মেয়েটির মুখের দিকে তাকাইনি। আমি হ্যাংলা টাইপের নই। মেয়েদের সামনে ডোন্ট কেয়ার ভাবটাই বজায় রাখি। বয়সে বড় হোক বা ছোট—আমার তাতে কী! সময় কেটে গেলেই হলো।
এমন সময় ট্রেন ছেড়ে দিল। মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তারপর আমার সামনে এসে এগিয়ে এল। আমার নিশ্বাস তখনও গরম। হঠাৎ হাততালি মেরে বলল, "এই ছেলে, দে!"
আরে! এ তো না নারী, না পুরুষ। পাঁচ টাকার একটা কয়েন ধরিয়ে দিলাম। সে হাততালি মারতে মারতে অন্যদের দিকে চলে গেল।
ভাঙা মন নিয়ে জানালার দিকে তাকালাম। ধানখেত, দিগন্তজোড়া ফাঁকা মাঠ, নদী—সবকিছুকে পেছনে ফেলে ট্রেন দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। দস্যুদের মতো ঠান্ডা হাওয়া ধেয়ে আসছে আমার দিকে। কিছু সময় এভাবেই কেটে গেল। দেখতে দেখতে ক্লান্তির ভারে সূর্য অনেক দূরে আকাশ থেকে হুট করে পড়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। অন্ধকার নেমে এল পৃথিবীতে। বাতাস আরও ঠান্ডা লাগছে এখন। মন, মেজাজ আর কল্পনা—সব বন্যার স্রোতের মতো ভেসে চলেছে।
ভাবতে লাগলাম, বিয়েবাড়িতে কী কী হতে পারে। কীভাবে নিজের ভাবধারার ব্যাখ্যা করব সেখানে। এসব নানান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ তো আর অন্য কোনো বিয়েবাড়ি নয়, যে যাব, খাব, ফিরে আসব। এ হলো পুটুর বিয়ে। আর আমি তার একমাত্র আদুরে দাদা। খাওয়াদাওয়া তো আছেই, কিন্তু তার আগে ইমপ্রেশনের ব্যাপারগুলো ভেবে নেওয়াটাও কম জরুরি নয়।
মাসির বাড়ি হলো গণ্ডগ্রাম। তাতে হলেও কমাসমা বিয়েবাড়ি হবে না—সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। মাসিদের সত্তর বিঘা ধানজমি, তিনটে ট্র্যাক্টর, চল্লিশ বা তারও বেশি গরু, সঙ্গে হাঁস-মুরগির খামার। ইয়া বড় পুকুরে মাছের চাষ। মানে, হুলুস্থুল ব্যাপার।
মাসির দুই মেয়ে। পুটু হলো বড়। মেসো লোকটি তার মেয়ের বিয়েতে কী কী ঘটাতে পারে, তা কল্পনা করেই জলপিপাসা পাচ্ছে। বিয়েবাড়ি রূপেই হিসেব কষে নিচ্ছি। কীভাবে এন্ট্রি নেব, কীভাবে ধীরে ধীরে কথা বলব, বড় যাত্রীদের কীভাবে আপ্যায়ন করব। আর যদি আমার কঠোর মনে গেঁথে যাওয়ার মতো কোনো সুন্দরী পাই, তবে তার কাছে কীভাবে নিজেকে প্রেজেন্ট করব। পারলে টুক করে একটু প্রেমও করে নেওয়া যেতে পারে।
একটু প্রেম করলে চরিত্রে দোষ লাগে না। বরং এতে ভগবান খুশিই হন। পৃথিবীর চারদিকে হিংসা, নৈরাজ্য চলছে, আর তার মাঝখানে আমি আমার ভালোবাসা উজাড় করে দিচ্ছি। এ কম কিছু না। কথাগুলো ভেবেই নিজেকে কেমন যেন মহান লাগছে।
ভয়ানক টাইপের কিছু তো করব না। ওই এক রাতের কিছু সময় পর্যন্ত। পুটুর বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে থেকে মাল্যদান পর্যন্ত জীবিত থাকবে এই প্রেম। অবশ্য আমি নিশ্চিত নই যে এমন ঘটনা ঘটবেই। কারণ আমার পছন্দ একটু উচ্চমার্গের।
তবে বিয়েবাড়ি হবে বিয়েবাড়ির মতো। যাব, খাব, চলে আসব—ছ্যাঁ ছ্যাঁ! বরং ছাপ ফেলে আসব। ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিদের শোনানোর মতো কিছু গল্প সৃষ্টি করে নিয়ে আসব।
এই যৌবন তপ্ত হতে পারে, কিন্তু এতটুকু বাস্তবজ্ঞান আছে যে, বিয়েবাড়ির প্রেম আর মালটানা ট্রেন একই রকমের—দেখা যায়, কিন্তু চড়া যায় না।
ট্রেন থেকে নামলাম। চারদিকে আলো-অন্ধকার মাখামাখি হয়ে আছে। এবার বাস ধরার পালা। আধঘণ্টার পথ। ট্রেনের মতো বাসেও যদি একটা জানালার ধারের সিট বাগাতে পারি, না! বাকি কল্পনাগুলো সেরে ফেলা যাবে। কলেজ ইউনিফর্মটা কেমন যেন ঘেমো গন্ধ ছাড়ছে।
স্টেশনের বাথরুমে গেলাম। বদলে ফেললাম সেটা। তার পরিবর্তে গায়ে চাপালাম খাদির শেরওয়ানি। গতকালই বিষ্ণুপুর থেকে কিনেছি। সঙ্গে নাগরাই জুতো। জুতোর সামনেটা আবার শামুকের খোলার মতো পেঁচানো। শেরওয়ানি এক কথায় অনবদ্য। বুকের কাছে কী সব জটিল নকশা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। কালো ধুতি কোঁচ মেরে পরলাম। স্থান-কাল-পাত্র বুঝে ওড়নাটা গলায় দিলাম না। বিয়েবাড়িতে ঢোকার আগের মুহূর্তে চাপাব। পাবলিক প্লেসে একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
বাথরুমের বেসিনে ফেসওয়াশ করে নিলাম। ক্রিম-ট্রিম সঙ্গেই ছিল। চুলও ব্যাক ব্রাশ করে নিলাম।
বাইরে বেরোতেই বুঝলাম, লোকের নজরে পড়ে গেছি। সামনে যারা আছে তারা তো বটেই, দূর থেকেও অনেকে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমার তাতে কিছু যায়-আসে না। একদম প্রস্তুত হয়েই ঢুকব বিয়েবাড়িতে। চোখের পাওয়ারওয়ালা চশমাটা খুলে একবার মুছে নিলাম।
স্টেশন চত্বর পেরোলেই বাসস্ট্যান্ড। তখনকার দিনে বাস খুব একটা বেশি ছিল না। একটা মিস করলে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি, একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকেই এগিয়ে গেলাম।
এরপর আর বেশি কিছু বাকি নেই। আধঘণ্টার বাস সফর কোনোমতে টেনে দিলেই হলো। বাসস্ট্যান্ড থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা রাস্তা। ব্যাস, পৌঁছে যাব বিয়েবাড়িতে। এখন সবচেয়ে বেশি দরকার বাসের জানালার ধারের একটা সিট। ট্রেনে পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু বাসের জানালার ধারের রোমাঞ্চই আলাদা। বাতাসের আক্রমণ সেখানে অনেক বেশি জোরাল। ট্রেনের থেকে বাসের সফরই আমার বেশি ভালো লাগে। ট্রেন সফর যেন ঘটনাবিহীন—একই রকম ধানখেত, মাঠ, ব্রিজ। প্রথম প্রথম ভালো লাগে, তারপর বিরক্তি আসে। বাসে বরং সে সমস্যা নেই। পদে পদে বৈচিত্র্য।
শেরওয়ানি চাপিয়ে দারুণ আরাম লাগছে। নরম, দামি বিষ্ণুপুরি কাপড়। মনে হচ্ছে, যেন সারা শরীরময় বাতাস বেঁধে রেখেছি।
বাসের কাছে পৌঁছে স্বপ্নভঙ্গ হলো। তেমন ভিড় নেই, কিন্তু একটাও জানালার ধারের সিট ফাঁকা নেই। আমরা পুরুষ মানুষ। মানিয়ে নেওয়ার বিপুল ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছি। অগত্যা বাসে উঠলাম। ও মা! সব সিটেই কেউ না কেউ বসে আছে।
আচ্ছা, হোক। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যাওয়া যাবে। এইটুকু সময়ই তো। খালি বাস, চারদিকের জানালা দিয়ে বাতাস ঠিক খেলেই যাবে।
আমি বাসে উঠতেই সামান্য কাঁপুনি দিয়ে বাস স্টার্ট নিল। উদ্ভট রকমের একটা হর্ন বাজল। কন্ডাক্টর দরজায় নির্মমভাবে আঘাত করতে করতে চিৎকার করতে লাগল।
এরপরই ঘটল আসল ঘটনা।
বাস ছাড়ার আগের মুহূর্তে কিলবিল করে লোক, মহিলা, বাচ্চা—সবাই একসঙ্গে উঠতে শুরু করল। যেন বৃষ্টির জল পড়তেই গর্ত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পোকা বেরিয়ে আসে। আমাকে মেরে, মুড়ে, ঠেলে, চ্যাপ্টা করে সবাই পেছনের দিকে এগোতে লাগল। লোকেদের গালাগালি, মেয়েদের বাচ্চা খোঁজা, বাচ্চাদের মা-হারানো কান্না, তার মাঝেমাঝে ছাগলের "ব্যা-ব্যা" আর মুরগির "কক-কক"—সব মিলিয়ে যেখানে একটু আগেও শান্ত নদীর মতো পরিবেশ ছিল, মুহূর্তের মধ্যে সেটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছি। চারদিকের মানুষ আমাকে পিষে দিয়েছে।গায়ে মাখা দামি বডি স্প্রে অনেক আগেই আত্মহত্যা করেছে। চারদিকে কেবল ঘাম আর আশটে গন্ধের এক অদ্ভুত মিশ্রন উড়ে বেড়াচ্ছে।
কিছু সময় পর বাস প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়ল। রাস্তা খানা-খন্দে ভরা।বাস কখনো ডানে হেলে পড়ে, আবার কখনো বাঁয়ে।হেলা হেলির খেলা বাসের তালে তালে ভেতরেও চলছে। তবে সব মন্দে ভালো দিকও থাকে। এই ভিড়ের জন্য অন্তত রড ধরে দাঁড়াতে হচ্ছে না। সামনে লোক, পেছনে লোক, ডানে লোক, বাঁয়ে লোক—মানুষের চাপে আমি নিজেই বাসের একটা ফিটিংসে পরিণত হয়েছি।
কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। হঠাৎ কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো। নিচে তাকিয়ে দেখি—ও মা! একটা ছাগল দিব্যি আরাম করে আমার কনুই চাটছে।
গা গুলিয়ে উঠল। ভয়ও লাগল। এভাবে যদি চাটতে থাকে, তা হলে মাসির বাড়ির বাসস্টপ পর্যন্ত আর পৌঁছানো হবে না। তার আগেই আমি ছাগলের পাকস্থলীতে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে জমা পড়ে যাব।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বাস কোথায় চলছে তা বোঝারও উপায় নেই। ভিড়ে জানালা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। ঘামের গন্ধ তো আছেই, তার ওপর মাঝেমধ্যে এমন সব বিকট গন্ধ ভেসে আসছে, যার স্রষ্টাদের পরিচয় অজানা হলেও এটুকু নিশ্চিত—ক্ষমতা সাংঘাতিক। মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষকে অজ্ঞান করে দেওয়ার দম রাখে।
মনে মনে ভগবানকে ডাকলাম।
—হে ভগবান, নরকের ট্রেলার যদি দেখিয়েই থাকো, তা হলে এবার পুরো সিনেমাটা বন্ধ করো।
কিন্তু ভগবান বোধহয় মাঝে মাঝে কানে হেডফোন গুঁজে বসে থাকেন। আমাদের আবেদন-নিবেদন তাঁর কানে পৌঁছায় না।
প্রায় আধমরা অবস্থায় নিজের স্টপেজে নামলাম। বাস থেকে নেমেই শরীরটা কেমন গুলিয়ে উঠল। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেলাম। মুখেও জল দিতাম, কিন্তু ক্রিম উঠে যাবে—এই ভয়েই আর দিলাম না।
বাসস্ট্যান্ড ফাঁকা। এটা কোনো নামী-দামী স্টপেজ নয়। এমনিতেই দোকানপাট কম, তার ওপর রাত হয়ে গেছে। ফলে লোকজনও নেই।
মাসির বাড়ির রাস্তা মূল রাস্তা থেকে ডান দিকে। সেদিকে তাকালাম। নিরেট অন্ধকার।
কিন্তু উপায় কী! ব্যাগটা কাঁধে তুলে সেই অন্ধকারের দিকেই হাঁটা দিলাম।
চতুর্থ পর্ব
কিছু পথ অতিক্রম করতেই হালকা আলোর আভাস পেলাম। অনেক দূরে আকাশের দিকে আলো যেন তাকিয়ে আছে। এ নির্ঘাত বিয়েবাড়ির আলো। এত কষ্টের পর এক চিলতে আনন্দ খেলে গেল। সেই আলো আমার উৎসাহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সেই ম্লান উজ্জ্বলতা লক্ষ করে আরও কিছুটা পথ এগোলাম। আলোর উজ্জ্বলতা দূরত্বের সঙ্গে কমে। সাধারণ নিয়ম। আমি সেই আলোকে হাতিয়ার করেই হেঁটেই চলেছি। একটা ক্লান্তি ভাব আসছে। রাস্তা এবড়োখেবড়ো কাঁচা। ভাগ্যিস বৃষ্টি হয়নি। তা হলে হাঁটার উপায় থাকত না। স্কেটিং করতে করতে পৌঁছে যেতাম।
বিপুল অন্ধকারের মাঝে মোবাইলের টর্চটা অসহায় হয়ে পড়েছে। তাও ভালো। এ নিরেট অন্ধকার পৃথিবীতে এক চিলতে আলো যেন জীবিত আছি, এই প্রমাণ দিচ্ছে। নইলে কী বা প্রাণ, আর কী বা আত্মা! অন্ধকারে সবই এক।
আরও কিছুটা পথ এগিয়ে গেলাম। কিন্তু আলোর উজ্জ্বলতা বাড়ছে না কেন! সেই আগের মতোই ম্যাড়মেড়ে, ফ্যাকাসে হয়ে আছে। তবে কি আমি একই জায়গায় ঘুরছি? ভেবেই বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। অন্ধকার রাস্তায় ভূতেরা নাকি এই কারসাজিই করে। প্রথমে অন্ধকারে ঘোরায়। তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়লে কোনো ডোবায় চুবিয়ে মারে। কেমন একটা বুনো ভয় জেগে উঠল মনে। যে পরিবেশ মাড়িয়ে হেঁটে চলেছি, এমন জায়গা ভূতেদের আনন্দ-আশ্রম।
সামনের দিকে মোবাইল তুলে ধরলাম। সামনে যত দূর অবধি দেখা যায়, তারই চেষ্টা করলাম। না, রাস্তা তো সোজা। আঁকাবাঁকা তো নেই। তা হলে দূরের আলোর উজ্জ্বলতা বাড়ছে না কেন? টর্চ আর রাস্তায় ফেলার সাহস হলো না। সামনের দিকেই মেলে ধরলাম। সোজা রাস্তাতেই যেতেই হবে আমাকে। বাঁকা যাওয়া যাবে না।
এমন না যে এই প্রথম এলাম। কতবার এসেছি। কিন্তু আজ জানি না কেন নতুন লাগছে। আসলে পথ বদলায় না, পরিবেশ বদলে যায়। পরিচিতকে অচেনা বানিয়ে ফেলে। হোঁচট খাওয়া এই নিয়মের মধ্যেই পড়ে। আমিও তাই করে চলেছি। একটা হোঁচট সামলাতে না সামলাতেই পরেরটা এসে উপস্থিত হচ্ছে। তাও কোনোমতে সামলে নিতে হচ্ছে নিজেকে। মনের ভেতরে এক দৃঢ় প্রচেষ্টা—সোজাই হাঁটতে হবে। বাঁকা যাওয়া যাবে না।
আকাশে চাঁদের বালাই নেই। যেটুকু দেখা যায়, তাকে চাঁদ বলা চলে না। না আছে তাতে উজ্জ্বলতা, না আবেগ। কেবল কিছু একটা আকাশের বুকে অস্পষ্টভাবে যেন বেঁচে আছে।
আমি আবার দূরের দিকে তাকালাম। সেই একই। কোনো রকমের উজ্জ্বলতা নেই। ম্লান সে আলো বলে দিচ্ছে, পথ অনেক বাকি, অথবা আমি পথভ্রষ্ট। ক্লান্তি ক্রমশ শরীরে পেঁচিয়ে উঠছে। তার সঙ্গে একটা গুমোট ভয়। এ রাতে আমি একা। তবে রাত বেশিও তো হয়নি। কটা আর বাজবে! ঘড়ি দেখলাম। রেডিয়াম লাগানো ঘড়ির কাঁটা দেখাচ্ছে সাতটা বেজে সাত মিনিট। বাজার নেই, দোকান নেই—কী করতে লোক এদিকে আসবে? এখন যে যার বাড়িতে ঢুকে গেছে। আবার রাত থাকতে থাকতেই উঠে পড়তে হবে কিনা।
রাস্তার দুদিকে ধানক্ষেত। ধান উঠে গেছে, তাই এপ্রান্ত হতে ওপ্রান্ত ফাঁকা। সেই শূন্যতায় জোনাকিরা নেচে বেড়াচ্ছে। গান গাইছে ঝিঁঝি পোকা। রাস্তার দুধারের বড় বড় গাছ অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলেছে।
মনে বড় অভিমান এল। পুটুর মন রাখতে কোথায় কোন বনবাদাড়ে ঘুরছি! কলেজে থাকলে এতক্ষণে হয়তো পল্লবীর প্রেম নিবেদন হয়ে যেত। প্রেমপর্বে জয়ী হয়ে বীরের মতো হোস্টেলে প্রত্যাবর্তন করতাম। কোথায় সে পরম প্রাপ্তি, আর কোথায় এই মৃত্যুর পথযাত্রী! বুক হুহু করে উঠল। কান্না পাচ্ছে কি? কে জানে! অন্ধকারে তাও বুঝতে পারছি না।
আচমকা বিশ্রি গলায় শেয়াল ডেকে উঠল। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। পিঁপড়ের ঝাঁকের মতো ভয় পা বেয়ে বেয়ে ওপরের দিকে উঠছে। ডাকের দিক বরাবর টর্চ তাক করে ধরলাম। আলো এদিক-ওদিক বোলাতেই বুকটা আবার ধক করে উঠল। আমার থেকে কয়েক পা দূরে রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে। একটা চলে গেছে ডান দিকে। জমির বুকের ওপর দিয়ে সেটা হারিয়ে গেছে অনেক দূরে। সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম। দূরে একটা বনের গায়ে যেন রাস্তাটা আছড়ে খেয়েছে।
মনে মনে বললাম—সোজা চলতে হবে। বাঁকা যাওয়া যাবে না। দ্রুত মাথা চালালাম। বিপদে কোন ভগবান বেশি এফেক্টিভ, সেই জনকেই খুঁজতে লাগলাম। কারও নাম মাথাতেই আসছে না। হায়, এবার কী হবে! কাউকে না কাউকে তো মনে করতেই হবে। নইলে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে প্রাণ নিয়ে টানাহেঁচড়া চলবে। আকুল হয়ে নাম ভাবছি। হঠাৎ একটা নাম মনে পড়ল—পুতনা রাক্ষসী।
অগত্যা সেই নাম জপে নাক বরাবর হাঁটা দিলাম। কয়েক পা এগোতেই বাঁকের মুখে চলে এলাম। ফাঁকা মাঠ হতে একটা খিলখিলিয়ে হাসি ভেসে এল।
হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমাকে ডাকছে। বারবার বলছে, "এই ডানের রাস্তা দিয়ে এগোতেই হবে।" আমি লৌহসম মনোবল নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছি। পুতনা রাক্ষসী বেশ কাজের তো। মনে ভালোই সাহস এনে দিচ্ছে। এখন কোনো বাঁকই আমাকে বাঁকাতে পারবে না।
আরও উচ্চ কণ্ঠে পুতনা রাক্ষসীর নাম জপতে লাগলাম। আমি যতই সোজা হেঁটে যেতে চাই না কেন, কিছু একটা শক্তি আমাকে প্রবলভাবে টানছে। পা ভারী হয়ে আসছে। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম—
"হে পুতনা রাক্ষসী, এই বিপদ হতে উদ্ধার করুন।"
দেবদেবীরা খেতে খুব ভালোবাসেন। উনাদের সহায়তা পাওয়ার এটাই একটা ট্রিগার। খাওয়ারের নাম ধরে ডাকলে উনারা উড়ে উড়ে এসে বাঁচিয়ে দিয়ে যান। সমস্যা হল, পুতনা রাক্ষসীর প্রিয় খাদ্য কী, আমার জানা নেই। রক্ত হলে ব্লাড ব্যাংক থেকে কয়েক প্যাকেট তুলে নেব। কিন্তু অন্য কিছু যদি হয়—যেমন কলিজা বা ঘিলু—তা ম্যানেজ করব কীভাবে! তাই খাদ্যের বিনিময়ে প্রাণরক্ষা, এহেন বিনিময় প্রথা আপাতত মূলতুবি রাখলাম।
বাঁকের মুখ হতে কয়েক পা এগিয়ে এসেছি। হাত জোড় করে রাক্ষসী বন্দনা করে চলেছি। হঠাৎ থামতে হল। কেউ যেন ডেকে উঠল বলে মনে হল। পায়ের কাঁপুনি আবার শুরু হয়েছে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কান পাতলাম।
—এই কেরে? কে ওখানে?
গম্ভীর গলায় মাঠের দিকের এক ঝোপ হতে আওয়াজ এল। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
—আমি... আমি অর্পণ।
—অর্পণ হোক বা তর্পণ, ওখানে দাঁড়িয়ে চেল্লাচ্ছিস কেনে? সব মাটি করে দিলি। আর হবেনি।
ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। কী মাটি করলাম আমি? কী হবে না? তবে যাই হোক, পুতনা রাক্ষসীর পাওয়ার আছে। আমি আবার রাক্ষসীর নাম জপ করার উদ্যোগ নিচ্ছি। যে একবার বাঁচিয়েছে, সে বারবার বাঁচাবে।
"জয় পু..." অবধি উচ্চারণ করে থেমে গেলাম। ওদিক থেকে আবার শব্দ হল। খুব কষ্ট হচ্ছে এমন ভাব।
—আবার চেল্লায়! এ তো দেখছি বদ ছোড়া। তা ওদিকে যাস কোথায়? ওদিকে তো শ্মশান। রাত-বিরেতে শ্মশানে কী মরতে যাচ্ছিস? মতলব কী তোর?
বলে কী! সোজা রাস্তা ধরে গেলে শ্মশান! রাস্তা বরাবর তাকালাম। গাছেরা পরপর দাঁড়িয়ে গলি নির্মাণ করেছে। সেই গলি অন্ধকার হতে অন্ধকারতর দিকে এগিয়ে গেছে।
আমি লোকটার গলার উদ্দেশে টর্চের আলো ছুড়ে দিলাম। কিছু দূরে একটা অবয়ব ঝোপের আড়ালে সট করে চলে গেল। এইটুকু সময়ের মধ্যেই বুঝলাম, লোকটা সম্পূর্ণ উলঙ্গ। মাটিতে উবু হয়ে বসেছিল। ঝোপের আড়াল থেকে হুঙ্কার ছাড়ল সে।
—আচ্ছা বদ ছোড়া তো! একে ভয় পাইয়ে আমার কষ্টকে কাঠিন্য করে দিলি। তার ওপর আবার আলো ফেলা হচ্ছে। নেহাত ধুতি গাছে টাঙানো আছে, নইলে গিয়ে এমন কান মলে দিতাম না!
আমি কিছুটা ভরসা পেলাম। এ মানুষ, ভূত না। ভূত আর যাই হোক, কান মোলার হুমকি দেয় না। মনে সাহস এনে বললাম,
—না মানে... সরি, সরি। বুঝতে পারিনি।
—তা কোথায় রওনা দিচ্ছ?
—বিয়েবাড়ি। মানে রতন সামন্তের বাড়িতে।
—রতনদা? তা ওদিকে যাচ্ছিলে কেন? রতনদার বাড়ি তো এদিকে। রাস্তা গুলিয়েছিস বুঝি?
অন্ধকারে মাথা নাড়লাম। লোকটা কী বুঝল জানি না। আবার গম্ভীর গলায় বলল,
—রতনদা কে হয়?
—মেসো।
—মেসো মানে?
মেসোর মানে আবার কী! বুঝতে পারলাম না। মেসোর মানে মেসো। মাসির বর—মেসো।
হঠাৎ করে লোকটা গলা পাল্টাল।
—তুই ছুটকির ব্যাটা?
ছুটকি আমার মায়ের ডাকনাম। আমি "হ্যাঁ, হ্যাঁ" করে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম।
—আরে, আমাকে চিনতে পারলি না? আমি নৃপেন মেসরে।
এবার চিনতে পারলাম। আমার মেসোর ছোট ভাই। বুকের সাহস আবার ফিরে এল। আমি ঝরঝরে গলায় বললাম,
—এ অন্ধকারে মাঠে বসে কী করছ তুমি?
—আর বলিস না। বাড়িতে রাজ্যের ভিড়। বাথরুম অল টাইম রিজার্ভ। ওদিকে বিয়েবাড়ির চাপ, এদিকে পেটের চাপ। সব যেন একসঙ্গে চেপে ধরেছে। তার ওপর বেণী ময়রা এখনো দই আনেনি। ওদিকে গ্রামের লোক খেতে এল বলে। তাই খোঁজ নিতে বেরিয়েছিলাম। এখানে এসে পেট কেমন যেন গুমরে উঠল। তাই ভাবলাম, আগে পেটের দই ফাঁকা করে নিই। নইলে ধুতিতেই হয়ে যাবে।
আরাম করে বসেছি। বেণী ময়রার কোন কোন ফ্যামিলি মেম্বার তুলে গাল দেব, তাই ভাবছি। এমন সময় পুতনা রাক্ষসীর নাম শুনে পিলে চমকে গেল। তুই এক কাজ কর। এই পথ ধরে কিছুটা হেঁটে যা। অল্প পথ। আমি বরং অন্য ঝোপে গিয়ে বসি। তোর চেঁচানিতে চাপটা বাপ বাপ করে পালিয়েছে। স্থান পরিবর্তন করে তাকে নামাতে পারি কিনা দেখি। দেরি করিস না, যা।
আমি সেই ডানদিকের বাঁকটা ধরে এগিয়ে চললাম। এবার বুঝলাম, ডান দিক কেন আমায় টানছিল। আসলে অবচেতন মনে পুটুর বাড়ির নকশা আঁকা আছে কিনা।
নৃপেন মেসো অন্ধকারে খচমচ শব্দ তুলে অন্য কোনো ঝোপের আড়ালে ঢুকে গেল। মেঠো পথ ধরে কিছু দূর গেছি। এমন সময় মাঠের দিক হতে একটা শঙ্খধ্বনি শুনতে পেলাম।
যাক, অবশেষে নৃপেন মেসোর পেটচাপ মুক্ত হল তাহলে।
পঞ্চম পর্ব
যে আলো এত সময় ধরে আবছা হয়েই ছিল, এবার তা উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। অর্থাৎ আমি সঠিক পথেই এগোচ্ছি। তবে অন্ধকার রাস্তা কিন্তু এখনো ফুরোয়নি। তাতে কী, সন্দেহ তো কেটে গেছে।
হঠাৎ মনে পড়ল, আমার ব্যাগে সিগারেটের প্যাকেট ও দেশলাই আছে। গুরুজনদের সামনে টানা যাবে না। এখানেই একটু কলিজায় শান্তি করা যাক।
ইতিমধ্যে চাঁদ মেঘের বাঁধন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছাই-মাখা এক অপরিচিত আলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজে নিলাম। ফাঁকা জমির এপ্রান্ত হতে ওপ্রান্ত জুড়ে ফিনফিনে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে আমাকেও আক্রমণ করতে ভুলছে না। চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে। বেশ আরাম লাগছে।
বাতাসে বার কয়েক চেষ্টা করে সিগারেট ধরালাম। জ্বলন্ত দেশলাই ছুড়ে দিলাম ফাঁকা মাঠে। হঠাৎ একটা কুত্তা খেউ করে উঠে ছুটে পালাল। সিগারেটে টান দিয়েই বুঝলাম, এই জিনিসটারই দরকার ছিল এতক্ষণ। নিকোটিন শরীরে যেতেই মন হালকা হয়ে গেল।
এলোমেলো আলো মেখে প্রকৃতি মায়াবী হয়ে উঠেছে। এই না যে আমি শহরের ছেলে। এই না যে এমন চাঁদফাটা আলো আগে দেখিনি। এই না যে এমনভাবে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, এমন ফুরফুরে বাতাস মাখতে মাখতে, এ আলোতে গা মাখাইনি। কিন্তু আজ অন্য রকম লাগছে। অন্য কিছু মনে হচ্ছে। বর্ণহীন কালো-সাদায় এক রঙবেরঙের ভালো লাগা।
সিগারেট টানতে টানতে পরের পরিকল্পনাগুলো করে নিলাম। এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে গা ভাসালে চলবে না। সৌন্দর্যের ঠেলা এড়িয়ে বাস্তবে ফিরতে হবে। সে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। আমাকে বিয়েবাড়িতে ঢুকতে হবে। প্রথম ইমপ্রেশনটাই আসল। এমন একটা জৌলুশ ছড়িয়ে দিতে হবে, যেন সবাই থ মেরে যায়। আমিই যেন হয়ে উঠি সবার লক্ষ্য। মনে রাখতে হবে, এত বড় একটা বিয়েবাড়ি। হাই-ফাই গেস্ট। ভাগ্যে থাকলে কিছু সুন্দরী। ষোলো থেকে কুড়ি। এটাই আমার রেঞ্জ। এর কম হলে তাকানোই যাবে না। বেশি হলে তো গুরুজন।
প্রেমের পথে আমি আপাতত নেই। কারণ পল্লবীর সঙ্গে বেইমানি হবে। তবে বুকে আগুন জ্বালানো যেতে পারে। এতে দোষ হবে না। বরং মজাই হবে। ওরা পাত্তা পেতে চাইবে, আমি ভ্রুক্ষেপ করব না। ওরা যেচে কথা বলতে চাইবে। আমি গম্ভীর ভাব দেখাব। উফ, কী মজাই না হবে! আজ রাতটুকুই। কাল হোস্টেলে পৌঁছালে অন্য প্রাপ্তি। প্রেম হওয়ার আগে একে প্রিপ্রেম পার্টি বলা যায়।
শেরওয়ানি ঝেড়ে-ঝুড়ে তার পূর্বের আকার দিলাম। ওড়না বের করে বাঁ দিক করে চাপিয়ে নিলাম। চুল এলোমেলো হয়ে ছিল। তাকেও হাত দিয়ে ঠিকঠাক করতে হল। কেন জানি না, ক্লান্তি ভাবটা চলে গেছে। বরং বেশ ঝরঝরে লাগছে শরীর। নিকোটিন ভালোই কাজ দিয়েছে। সিগারেট তামাক পেরিয়ে ফিল্টারে পৌঁছে গেছে। ফেলে দিতে গিয়েই থামলাম। পাছে আবার কুকুরের গায়ে পড়ে। আগেরটা বোধহয় নিরীহ ছিল, তাই কিছু বলেনি। এবারেরটা যদি তেড়ে আসে! রাস্তায় ফেলে জুতো দিয়ে ডলে দিলাম। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম বিয়েবাড়ির উদ্দেশ্যে।
ও হরি! এ কী দেখছি! এ কি বিয়েবাড়ি, না অন্য কিছু? মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠলাম। এ সব কী করেছে মেসো? এটা বিয়েবাড়ি নে যেন বন্যার ক্যাম্প খাটিয়েছে মেস।
চারদিকে কয়েকটা বাঁশের খুঁটি পোঁতা। তাতে চেরা-ফাটা, রংচটা কাপড় টাঙানো। ভালো করে দেখলাম। এগুলো তো প্যান্ডেলের কাপড় বলে মনে হচ্ছেনা। কাপড়ের ফাঁক দিয়ে কালো ত্রিপল দেখা যাচ্ছে। আবার ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে গরুর গোয়াল দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটা সাদা বলদ দাঁড়িয়ে আনমনে খড় চিবোচ্ছে। আমার সঙ্গে একবার তার চোখাচোখি হল।
আলো বলতে কয়েকটা একশো ওয়াটের বাল্ব উপর থেকে ঝুলছে। আমি প্যান্ডেলের গেটে দাঁড়িয়ে হা করে দেখছি। মণ্ডপে কয়েকটা গাঁদা ফুলের মালা গোল গোল করে ঝোলানো। রজনীগন্ধার চেন টাঙানো শুরু হয়েছে। বোধহয় রজনীগন্ধার খরচ মেসো বাদই দিয়েছিল। কারও ঝাড়াঝাড়িতে বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছে। সেইগুলোই এখন টাঙানো চলছে।
মণ্ডপের একদিকে কাঁচুমাচু মুখে মেসো দাঁড়িয়ে তা দেখছে। বিপুল খরচের ভারে উনি যেন শোকস্তব্ধ। মণ্ডপের এদিক-ওদিক মাদুর পাতা। চেয়ারের খরচও কাটিং হয়েছে। হাল দেখে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছি— ঢুকব, না পালাব? রাতটা কোনোমতে স্টেশনে কাটিয়ে, সক্কাল-সক্কাল হোস্টেল।
আমার সামনে খালি গায়ে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। পরনে লুঙ্গি। তার উপরে ছাতার মতো ভুঁড়ি উনমুক্ত ভাবে জেগে উঠেছে। এমন সময় দুটো বাচ্চা ছেলে লাঠি বাগিয়ে আমার সামনে দিয়ে ছুটে গেল। চোর-পুলিশ খেলা চলছে বোধহয়। তারা তাদের মতো মজা লুটছে।একজনের প্যান্ট ঘুঁসিতে গোঁজা। সে মনে হয় চোর। পুলিশ ডান হাতে প্যান্ট ধরে তার পেছন পেছন ছুটছে। বাঁ হাতে একটা লাঠি বন্দুকের মতো ধরা। চোর যেমন হাতের বাইরে, তেমনি প্যান্টও। কোনোটাকেই বাগে আনতে পারছে না। প্যান্টের বাঁ দিক বিপদসীমার নিচে ঝুলে পড়েছে। পাতিটা কোনোমতে আড়াল হলেও যন্ত্র বেরিয়ে পড়েছে।
কানের কাছে কেমন একটা ঘড়ঘড়ে শব্দ হল। চমকে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, সেখানে দুটো ছোট ছোট বক্স। তাতে উদ্ভট কিছু শব্দ হচ্ছে। ধীরে ধীরে কান এগিয়ে নিয়ে গেলাম। ওরে বাবা! তো সানাইয়ের শব্দ! ইস, কারও বক্সের সামনে লিখে দেওয়া উচিত ছিল— "এখন বিয়ের সানাই বাজছে।"
মাথা ঝা করে গরম হয়ে গেল। এই বিয়েবাড়ির জন্যই আমি আমার কল্পকন্যাকে ছেড়ে এসেছি। মেসো কিপটে, সে জানতাম। কিন্তু কিপ্টেমি যে লাগামছাড়া, সেটা বুঝিনি। মণ্ডপের যদি এই হাল করে, তো খাওয়ায় কী করবে? ভেবেই ভয় লাগল। ভেন্ডির টক আর আলু মাখা না তো!
বাড়ির ভেতরে যেতে গিয়েই মায়ের সঙ্গে দেখা। হাতে কাঁসার থালায় কী সব সাজিয়ে মণ্ডপের দিকে যাচ্ছে। আমাকে দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল,
— কিরে, কখন এলি?
বলেই ঝড়ের গতিতে কোথায় যেন চলে গেল। আমার পেছনে খরচ করার মতো সময় যেন নেই মায়ের কাছে।
পুটুর কাছে যাওয়ার আগে ভাবলাম, হেঁসেলে একটু চোখ বুলিয়ে যাই। বিয়েবাড়ির দশা যে কতটাই নির্মম হতে পারে, সে সত্যি জানার অধিকার সবার আছে।
হেঁসেলে হুলুস্থুল কাণ্ড। বাবা এবং কিছু লোক মিলে ভয়ানক কিছু করে চলেছে। মাংস কষার গন্ধ তীরের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে আমার নাকে ঢুকে গেল। এবার বুঝতে পারলাম, খিদে পেয়েছে। বাবার হাতে লম্বা একটা খুন্তি। মাংসের নাড়াচাড়া চলছে। আমি ধীরে ধীরে গেলাম বাবার কাছে। বাবার চোখ ধোঁয়ায় লাল হয়ে গেছে। বাবা রান্না চমৎকার করে। কিন্তু অভ্যেস নেই। ব্যাংকের কলম ধরা হাত। তাতে খুন্তি বেমানান লাগছে। বাবাও যেন আমায় চিনতে চাইছে না। আমি পৌঁছাতেই বাবা বলল,
— কষা হয়ে গেছে। এক পিস খাবি?
বাড়িতে যেমন আমার জন্য বরাদ্দ থাকে, ঠিক তেমনই। আমি মাথা নাড়াতেই শালপাতায় কয়েক পিস তুলে দিল বাবা। প্রথমে বুঝিনি, পরে বুঝলাম। আরিব্বাস! এ তো খাসি! মেসো এত সময় বেঁচে আছে কী করে? এতক্ষণে তো মেঘ ছাড়িয়ে নরকের দিকে খানিক এগিয়ে যাওয়ার কথা। কথা না বলে শালপাতায় মন দিলাম। খিদে কিছুটা মিটল। মনও পুরোপুরি ভরে গেল আমার। এবার বীরদর্পে এগোলাম পুটুর দিকে।
ঘরে ঢুকতেই মেয়েদের ঝাঁক চোখে পড়ল। বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে। কয়েকটা আমার রেঞ্জে আছে বটে, কিন্তু মনের মতো না। আমি তাকালাম না তাদের দিকে। ভস্মে ঘি ঢালা যাবে না। মেয়ে সরিয়ে সটান সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম পুটুর সামনে। রাগি গলায় বললাম,
— এই তোর বিয়ে! এর জন্য কেঁদে ভাসালি?
পুটুর গলাতেও অভিমান।
— আমি কী করব বল তো? একটা হাড়-গিলে কিপটে বাবা পেয়েছি। বিয়েটাই ক্যাচাল করে দিল।
আমি আরও রেগে বললাম,
— তুই কর বিয়ে। আমি চললাম।
— কোথায় যাবি?
— হিমালয়। তোর বিয়ে দেখার থেকে সেখানে ল্যাংটা হয়ে ধ্যান করা ভালো।
কয়েকটা মেয়ে খিকখিক করে হেসে উঠল। অভিমানে চোখ ছলছল করে উঠল ওর। আমাকে অসহায়ভাবে দেখল। আমিও তাকে দেখলাম। অপটু হাতে কালিভুষি মাখিয়ে সুন্দর মুখটাকে এরা মঞ্জুলিকা বানিয়ে ছেড়েছে। এর থেকে না সাজলেই আরও সুন্দর লাগত।
টুকুর মাথায় হাত বোলালাম। বড্ড বেশি বলা হয়ে গেল মনে হয়।
— রাগ করলিরে, টুকু?
— রাগ করব কেন? এমন হাল হবে, আমিও কি জানতাম? এই দেখ।
বলে একদিকে ইশারা করল। দেখি, নাইসিল পাউডার, আলতা আর কাজল পড়ে আছে।
আমি বললাম,
— কী এগুলো?
— বিয়েতে আমার সাজার জিনিস।
আবার চোখ ছলছল করে উঠল ওর।
— লিপস্টিকও কিনে দেয়নি।
মাথা নাড়ল টুকু।
আমি অবাক হয়ে দেখছি ওকে।
— তাহলে ঠোঁটে কী মেখেছিস?
— ওই আলতা।
চোখের গোড়ায় বিন্দু বিন্দু জল দেখা গেল ওর। জল বেরোতেই ওর বান্ধবীরা হো হো করে উঠল।
— এই, কাঁদবি না। কাঁদবি না একদম। তোর চোখে কাজল টিকছে না। আবার মুছে যাবে। কাজল আর নেই কিন্তু। চাইতে গেলে তোর বাবা আবার বুক ধরে নিয়ে বসে পড়বে।
আমি ব্যাগ খুলে নিজের বডি স্প্রে, ক্রিম আর যা যা আছে বের করে দিলাম। বরটা যদি বর্বর না হয়, তো এই একবারই বিয়ে হবে টুকুর। ইস! আগে জানলে সাজার সব কিনে আনতাম। মন খারাপ হয়ে গেল আমার।
— টুকু, এই উপদ্রব আমার সইছে না। আমি বরং জমিনবাড়িতে গিয়ে বসি।
টুকু চোখ নামিয়ে নিল।
আমি সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই পকেটে চালান করে ব্যাগ রেখে দিলাম ওর আলমারিতে। এ বিয়েতে হ্যান্ডিক্যাম বের করে আর কাজ নেই। কিছু স্মৃতি আছে, যাদের ভুলে যেতে হয়। মনে এনে মন খারাপ করতে নেই।
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। কী করব ভাবছি। মাঠ যেমন ফুরফুরে ঠান্ডা লাগছিল, এই জায়গাটা বিশ্রী রকমের গুমোট। কিপটে মেসো টাকা বাঁচাতে পাখাও ভাড়া করেনি। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, জমিনবাড়িতেই বাকি সময়টুকু বসে কাটাব।
জমিনবাড়ি। ছেলেবেলার একগুচ্ছ স্মৃতির সোঁদাল গন্ধ নাকে এসে ঠেকল যেন। এটাই ছিল মাসির বাড়ির মূল আকর্ষণ। এই জন্যই তো এখানে আগে আসতাম।
জমিনবাড়ি বলতে কোনো দুর্গ, রাজপ্রাসাদ বা জমিদারবাড়ি নয়। নিতান্ত মাটির এক কামরার একটা ঘর। খড়ের ছাউনি। কিন্তু তার অবস্থান এত অপূর্ব স্থানে— উফফ, কী বলব! আগেও বলেছি, মাসিদের চাষের জমি সত্তর-আশি বিঘে। মাসির বাড়ির গোয়ালের পেছন থেকে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেছে। মানে, যেদিক দিয়ে এসেছি তার বিপরীতে। সরু রাস্তা। বাঁশবন ও নানান আগাছা দিয়ে ঢাকা। এই রাস্তা বরাবর বেশ কিছুটা গেলে বিরাট একখণ্ড ভরাট করা জমি। তার অনেকটাই জুড়ে অনেক বড় এক পুকুর। পুকুর ঘিরে সবজি বাগান। পুকুরের ঘাট সান-বাঁধানো। এই জমির অপর দিকে মাসিদের সেই বিপুল আয়তনের ধানজমি। মানে, চুলের টেরির মতো। টেরির একদিকে সবজি বাগান, পুকুর, আর অন্যদিকে ধানজমি। তার সন্ধিজমিতে আছে জমিনবাড়ি। পুকুরঘাটের দিকে দরজা ও ধানজমির দিকে জানালা নিয়ে। আসল উদ্দেশ্য, ধান চাষের সময় জমির ওপর নজরদারি রাখা। চাষের সময় মেসো এই বাড়িতেই থাকে।
ছেলেবেলায় পুটু আর আমি কত গল্প করেছি এই পুকুরঘাটে। পুকুরে ইয়া বড় বড় মাছ। ডাঁটা চচ্চড়ি দুজনকে বাটিতে দিত মাসি। আমরা নিয়ে চলে আসতাম এখানে। ঘাটে বসে বসে ডাঁটা চিবিয়ে পুকুরের জলের কাছে ধরতাম। মাছ নিজেই টুক করে ছিনিয়ে নিয়ে যেত। ডাঁটা, করলা, উচ্ছে— এসব আমার ভালো লাগে না। কিন্তু জায়গাটার কী গুণ আছে জানি না। সব দারুণ লাগত।
পুকুরের চারদিকে ভরাট সবজি বাগান। কী ফলত না তাতে! ভেন্ডি, পটল, আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, বেগুন— মানে, হেন কোনো সবজি নেই যার চাষ হয়নি। কত রকমের শাকগাছ ছিল, তা গুনতে গুনতেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে যাবে। সব মিলিয়ে দারুণ ব্যাপার।
একবার মনে আছে। আমি আর পুটু এই জমিনবাড়িতে বসে আচার খাচ্ছি। অমনি এল তুমুল বৃষ্টি। মানে, রীতিমতো দৃশ্যকে অদৃশ্য করে দেওয়ার মতো বৃষ্টি। পুটু জমির দিকের জানালা খুলে দিল। ধানের ক্ষেতে সেই মেঘভাঙা বৃষ্টির চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে বলছিলাম, এই বৃষ্টি যেন কোনো দিনও না থামে। তাতে পৃথিবী ভেসে যায় যাক।
বৃষ্টি দেখছি দুজনে বসে। এমন সময় একটা ইয়া বড় শোল মাছ দিল জমি থেকে লাফ। আমি আর পুটু ছুটে গেলাম। বৃষ্টি নিয়ে ভাবার সময় নেই। তীরের মতো বৃষ্টিগুলো গায়ে আছড়ে পড়ছে। ব্যথা করছে চামড়ায়। কিন্তু শোল মাছ ছাড়া যাবে না। মাছ যে এইরকম ডাঙায় লাফ দিয়ে ওঠে, শুনেছি। তবে চোখের সামনে এই প্রথম দেখা। পুটু আর আমি দুজনেই ছোট তখন। এত বড় মাছের সঙ্গে কী পারা যায়! মাছ পিছলে পালাতে চাইছে, আর আমরা কোনোমতে জাপটে ধরে আছি। মাছ ভার্সাস আমরা দুজন।
এমন সময় ইয়া বড় সাইজের কই মাছ দিল লাফ। ফাঁপরে পড়লাম দুজন। শোলকে অবহেলা করলে অভিমানে পালাবে। আবার কইকেও ছাড়া যাবে না। টেনশন যে কী জিনিস, সেদিন বুঝেছিলাম। অগত্যা পুটুর হাতে শোলের দায়িত্ব অর্পণ করে আমি কই জয় করতে গেলাম। আগে কোনো দিনও ধরিনি। মোক্ষম কাঁটা বিধিয়ে একাকার কাণ্ড। তাও হাল ছাড়িনি।
সেদিন গোটা চারেক শোল আর বাইশটার মতো কই মাছ ধরেছিলাম। কী মজা, কী মজা সেদিন!
পরের দিন কই মাছের হল তেল কই, আর শোল মাছের কালিয়া। বাবা রান্না করেছিল। কেবল গন্ধটাই পেয়েছিলাম। খেতে পাইনি। কারণ, আমার আর পুটুর হল ধুম জ্বর। পাশাপাশি কাঁথা জড়িয়ে অচেতন হয়ে শুয়ে ছিলাম।
আজ সব পালটে গেছে। আমি বড় হয়েছি। পুটু বিয়ে করছে।ভাই বোনের সে সম্পর্ক হয়তো আর আগের মত থাকবে না।নতুন জীবনে ও হারিয়ে যাবে।আমিও হারিয়ে যাব। সময় এত দ্রুত বয়ে যায় কেন?
ষষ্ট পর্ব
জমিনবাড়িতেই যাব। জানি না আর কোনো দিনও মাসির বাড়ি আসতে পারব কিনা। সামনের বছর থার্ড ইয়ার হবে। ক্যাম্পাসিং, চাকরি— সব মিলিয়ে সময়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। পুটুও শুনছি বিয়ের পর হায়দরাবাদে চলে যাবে। তার বর সেখানেই চাকরি করে। সেও তো হুটহাট আসতে পারবে না। সব কিছুই বদলে যাচ্ছে। তাই আপাতত শেষবারের মতো ঘুরে আসি জমিনবাড়ি থেকে।
তাছাড়া ক্লান্তি লাগলে ওই ঘরের বিছানায় কিছু সময় শুয়ে নিতে পারব। এমনিতেই তো বিয়েবাড়ির সাধ মিটে গেছে। বাবা কিন্তু খাসি বেশ রেঁধেছে। একটু বিশ্রাম দরকার এখন। নইলে মন ভরে খাওয়া যাবে না। সব হারিয়ে এখন এই জিনিসটাই মুখ্য আকর্ষণ।
এখান থেকে দশ মিনিটের মতো হাঁটলেই জমিনবাড়ি। মাসির কাছে চাবি চেয়ে নিয়ে হাঁটা দিলাম। এই রাস্তাও কাঁচা। এক হাত চওড়া রাস্তা হবে। হাঁটতে হয় খুব সাবধানে। একটু ব্যালান্স মিস মানেই সোজা পুকুরে। আমি সন্তর্পণে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে এগোতে লাগলাম।
ক্রমশ বিয়েবাড়ির কোলাহল যেন দূরে সরে যাচ্ছে। এই বিশাল পৃথিবীতে ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। আরও কিছুটা এগোতেই আচমকা একটা কোলাহল শুরু হয়েই থেমে গেল। বর এসেছে। মানে, বরযাত্রীরাও এসেছে। একবার গিয়ে চোখ বুলিয়ে আসব!না থাক। মালা দেখেই ভগবানের পরিচয় পাওয়া গেছে।
আমি পিছুটান এড়িয়ে এগিয়ে চললাম। গাছপালার ফাঁক থেকে আকাশ মাঝে মাঝে দেখা দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে। চারিদিক নিঝুম। কেবল পাতার ওপর আমার জুতোর চাপের মড়মড় আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
আরও কিছুটা যেতেই বাঁশবন এল। জমাট অন্ধকারের পাহাড় যেন আমার অপেক্ষায় করছে। রাস্তা তার মাঝ দিয়ে যেতে গিয়ে অন্ধকারে ডুবে অদৃশ্য হয়েছে। যদিও চেনা রাস্তা, তবু আজ কেমন যেন গা ছমছম করছে। মাঝে মাঝে অনেক দূরে আলগা কোলাহল। সেই কোলাহল বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছে— আমি কতটাই একা ও অসহায়। কিছু একটা ভুল হচ্ছে কি? হয়তো একা আসাটা উচিত হয়নি। বিপদে পড়লে বাঁচানো তো দূরে থাক, জানতেই পারবে না কেউ। সবাই বিয়ে নিয়ে মত্ত।
বাঁশবনের মধ্যে আমি প্রবেশ করলাম। চারিদিক নিঝুম অন্ধকারের নিরেট দেওয়াল হয়ে গেল। শিরশিরে ভাবটা আবার ফিরে এল। এ অন্ধকার এতটাই জমাট যে আমার টর্চের আলোও যেন শুষে নিচ্ছে। আমি কোনোমতে তার মধ্য দিয়েই হেঁটে চলেছি।
বাঁশপাতার কার্পেট বিছানো আছে রাস্তায়। সেই কার্পেটের ওপর দিয়ে খচমচ করে হাঁটছি। বাঁশে বাঁশে ধাক্কা লেগে কট কট আওয়াজ হচ্ছে। আমি অনন্তকাল ধরে যেন হেঁটেই চলেছি। ডান আর বাঁ দিকে যেদিকে তাকাই, বাঁশবন। মনে হচ্ছে, আমি যেন গুহাবাসী। রাতে বেরিয়েছি পশু শিকারে।
হঠাৎ বাঁশবনের গভীর থেকে কেউ যেন হো হো করে হেসে উঠল। আমার বুক বসে গেল। আগেও এই শব্দ শুনেছি। যখন মাঠের মাঝ দিয়ে বিয়েবাড়িতে আসছিলাম। তবে কি কিছু একটা আমার পিছু নিয়েছে? পা ঠকঠক করে কাঁপছে। মনের ভেতরে কেউ যেন বলছে— পাল। এখান থেকে পালা। যেদিকে চোখ যায় পালা। এ ভালো জায়গা না।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিছু সময় কাটল। গলা শুকিয়ে আসছে। ঢোক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। ওদিকে বাঁশপাতার ওপর দিয়ে কেউ যেন হেঁটে আসছে আমার দিকে। হেঁটে ঠিক না— আক্রমণ করার আগে নেকড়ের পদক্ষেপ যেমন হিসেবি ও ভারি হয়, ঠিক তেমনভাবে। কেউ যেন ধীরে ধীরে পা ফেলে আমাকে অন্ধকারে মেপে নিচ্ছে।
কী করব, আমি বুঝে উঠতে পারছি না। পালাব? চেষ্টা করলাম। পা যেন মাটিতে গেঁথে আছে। নাড়ানোই যাচ্ছে না। বাঁশপাতায় খচমচ করতে করতে খুব কাছে পৌঁছে গেছে সে বিপদ। তারপর সব চুপ। হয়তো আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মোবাইলের টর্চ সামনে বাগিয়ে ধরলাম। এ অন্ধকারে সামনে এই আলোর কোনো ভূমিকা নেই। তাও এভাবে টর্চ বাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। দূরের, অনেক অনেক দূরে— অস্পষ্ট কোলাহল শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে বাতাস বয়ে এসে বাঁশবনের পাতায় পাতায় নেচে যাচ্ছে। নিশ্চুপ ও নিথরভাবে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আরও কিছু সময় কাটল। অন্ধকারে অপরিচিত আতঙ্কের অপেক্ষায় আমি।
হঠাৎ বাঁশপাতায় আবার পায়ের শব্দ পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ উপলক্ষ করে টর্চের আলো ছুড়ে দিলাম। একটা শেয়াল পরি কি মরি করে পালাল। আবার সেই হাসির শব্দ শুনলাম। এবার বুঝতে বাকি থাকল না— এটা কটাস। আমাদের দুজনের কার্যকলাপ দেখে বেশ মজা পেয়েছে।
চিন্তা দূর হয়েছে। আবার চলা শুরু করলাম। আজ যা চলছে ট্রেন থেকে নামার পর, অনায়াসে একে ভ্রান্ত ভৌতিক দিবস হিসেবে পালন করা যেতে পারে। সত্যি সত্যি ভূত জিনিসটাই অবাস্তব— লোকগাঁথা। ঠিক ভগবানের মতো। নিজেকে কথা দিলাম, আর ভয় পাব না। এমনকি ভূত সামনে এসে দাঁড়ালেও না।
বাঁশবন পেরিয়ে খোলা মাঠে পৌঁছালাম। আকাশের চাঁদ তার সম্পূর্ণ রূপ উন্মোচন করেছে। ফ্যাকাশে না, ধবধবে সাদা দুধের মতো আলোতে ভরে গেছে সবকিছু। জমিনবাড়িটা সেই আলোর মধ্যে অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সবজিবাড়ি ফাঁকা। মেসো খরচ বাঁচাতে মনে হয় সব তুলে নিয়ে গেছে। যে পুকুরের মাছ কব কব শব্দ করে জল তোলপাড় করত, সে পুকুর বোবার মতো নিস্তরঙ্গ। মানে, মাছও ছেঁকে তুলে নিয়ে গেছে। ওদিকে ধানক্ষেতও ফাঁকা। কেবল চাঁদের আলোতে...
কিন্তু এ কী!
গা বেয়ে একটা ভয় আবার নেমে এল। জমির ধারে কে বসে আছে? অসম্ভব! এই ফাঁকা জায়গায় কারও থাকারই কথা না। বিয়েবাড়ির আমোদ ছেড়ে কে-ই বা এখানে এসে বসবে? কিন্তু চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখছি। জমাট অন্ধকার মুড়ি দিয়ে বসে আছে কেউ।
শরীর কেঁপে উঠল। যে ভয় কিছু সময় আগে আমার শরীর ত্যাগ করেছিল, তা আবার পূর্ণ রূপে চেপে বসল। গলা শুকিয়ে আসছে। কাঁপা কাঁপা গলায় হাঁক দিলাম,
— কে? কে ওখানে?
এমন সময় বাতাস ধেয়ে এল। সেই বাতাসেই আচ্ছন্ন হয়ে দেখলাম— তার বিরাট বড় মাথাটা লিকলিকে ঘাড়ে ভর দিয়ে আমার দিকে সম্পূর্ণভাবে ঘুরে গেল। মানুষের মাথা কি এভাবে ঘুরতে পারে! আমার মাথাও ঘুরে উঠল। এ কী দেখছি! বারবার ভয় পেলে মানুষ একসময় আর ভয় পায় না। সেরকম হচ্ছে না কেন? সমস্ত শরীর আমার আড়ষ্ট। সেই মাথা আমার দিকে তাকিয়ে আমাকেই দেখে চলেছে। বাতাস এবার উত্তাল রূপ নিল। সেই তালে তালে বিশ্রীভাবে মাথা দোলাচ্ছে সে।
এসব কী দেখছি? মানলাম, গ্রামবাংলা। তা বলে কি পদে পদে ভৌতিক উপদ্রব হবে? মন শক্ত করলাম। জানি না কেন, হঠাৎ সাহস ফিরে এল। এ স্থানে ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই। কারণ বাঁচার কোনো উপায় নেই। তাই ভয় পাওয়া আর না পাওয়া একই ব্যাপার। ভয় একবার চলে গেলে রহস্য উন্মোচনের তীব্র ইচ্ছে হয়।
মোবাইলের টর্চ সোজা চালিয়ে দিলাম সেই দিকে।
হায় ঈশ্বর! এ তো ছোট একটা তালগাছ। একটা গোলাকার পাতা বাতাসে বেঁকে আছে আমার দিকে।
নিজের ওপর বিরক্তি লাগল। সব জায়গায় খামকা ভয় পাচ্ছি। সে বিয়েবাড়িতে আসার সময় হোক বা বাঁশবনে। ভয় যেন আমাকে পদে পদে অপদস্থ করছে। এবার মনে মনে নিজেকে কথা দিলাম— আর যদি কোনো কিছু দেখে ভয় পাই, তো পল্লবী ভোলার। আমি খই পুড়ব।
সপ্তম পর্ব
চাবি খুলে জমিনবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। সুইচ টিপলাম। ঝলমলে কমলা আলোতে ঘর ভরে গেল। অনেক সময় ধরে অন্ধকারে ভয় পেতে পেতে এই আলোটা বেশ ভালো লাগছে। মনের ভেতরে একনাগাড়ে সাহস গজিয়ে উঠছে।
ঘরের ভেতরটা বর্ণনা করার মতো কিছু নেই। একটা গদি পাতা খাট। হিসেব করার চেয়ার-টেবিল। ব্যস। খাটের নিচে মাদুরের স্তুপ। মেসোর মনে হয় নতুন ব্যবসা। ঘরটা দেখেই মন হু হু করে উঠল। সাধারণ ঘরে কত মিষ্টি স্মৃতি ভরে পড়ে আছে। নিজের অজান্তেই মন খারাপ হয়ে গেল। আজকের পর পুটু আর আগের মতো থাকবে না। কালকের পর আমিও আর আগের মতো থাকব না। পরিবর্তন জীবনের নিয়ম। সব নিয়ম তবে সুন্দর হয়েও কেমন মনমরা, মন খারাপ করে দেয়।
ভেতর থেকে একটা চেয়ার বের করে আনলাম। ধানক্ষেতের ধারে চেয়ার পাতলাম। সারা দিনের ক্লান্ত শরীরকে এবার একটু রেহাই দিতে হবে। উফ, কী আরাম যে লাগছে! সামনে দিগন্তবিস্তৃত ফাঁকা ধানক্ষেত। চাঁদের দুধেলা আলোতে ভরে গেছে। এদিক-ওদিক থেকে খাঁটি অক্সিজেনসমৃদ্ধ বাতাস বয়ে আসছে। ঠান্ডা, নির্মল, পবিত্র। জমির ওপ্রান্তে কেলেঘাই নদী বয়ে গেছে। তারই পাড় ঘেঁষে শ্মশান।
এ আরামে ঘুম নেমে আসছে। কিন্তু ঘুমানো যাবে না। ঘড়ি দেখলাম। আটটা বেজে তিন মিনিট। কিছু সময় এখানে কাটিয়ে বিয়েবাড়িতে গিয়ে সটান খাওয়াদাওয়া। তারপর কোন দিকে না তাকিয়ে সোজাসাপ্টা ঘুম। চুলোয় যাক মালাবদল। উচ্ছন্নে যাক পুটুর সিঁদুরদান। এখন ঘুমানো চলবে না। খাসি কিন্তু আজ প্রশংসা কুড়োবেই। কয়েক পিস কষা খেয়েই বুঝেছি। নটার দিকে ফিরলেই হবে। হাতে এখন এক-একটা ঘণ্টা। কীভাবে কাটাব, এটাও একটা বড় প্রশ্ন।
সিগারেট ধরালাম। চাঁদের সাদা আলোতে সিগারেটের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে। সেই মিশে যাওয়া মন দিয়ে দেখছি আমি।
সে যুগ তো আর এখনকার যুগ না— যে মোবাইলে দাবা খেলে বা রিলস দেখে সময়ের দফারফা করা যেত। সে সময়ে মোবাইলে একটাই বিনোদন ছিল— সাপ। সাপ খাওয়ার খাবে আর বড় হবে। তাছাড়া কাউকে যে ফোন করব, সে সুযোগও কম। টাওয়ার কোথায়? সে যুগে সামান্য চেষ্টা করলে ভগবান হয়তো পাওয়া যেত। কিন্তু টাওয়ার! অসম্ভব।
সাপের পেট ভরাই না হয়। এই ভেবে মোবাইল বের করলাম। কিন্তু এ কী! মোবাইলে জ্বলজ্বল করছে তিনটে টাওয়ার। বিস্মিত হলাম। সময় নষ্ট না করে সোজা ফোন লাগালাম মনের মাঝিকে... থুড়ি, মাঝিনীকে।
কয়েকটা রিং হল। তারপর পল্লবী ফোন ধরেই একগুচ্ছ অভিমান বিছিয়ে দিল।
— কখন থেকে ফোন করছি, ফোন লাগছে না। চিন্তায় চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার জোগাড়। তুইও আমায় ফোন করিসনি। ভুলে গেলি এর মধ্যেই? পরীক্ষা দিয়েই দৌড় লাগালি। আমি সামনে ছিলাম। কই, তাকালি না একবারও।
এই অভিমানগুলো মিঠে খেজুর রসের মতো। আমার বেশ ভালো লাগছিল। এই শূন্য স্থানে একজন কাছের সঙ্গী পেয়ে আরও ভালো লাগছে। ওর গলার স্বরের মধ্যে ম্যাড়মেড়ে কিন্তু নরম কিছু একটা আছে। শুনলে আরাম লাগে। ন্যাকামো করলে ভালো লাগে। আবার রাগ করলেও ভালো লাগে। দোষ দিলে ভালো লাগে, আবার ভালোবাসলেও ভালো লাগে। সব ভালো লাগে ওর।
আমি মন দিয়ে শুনছিলাম ওর সব কথা। কিছু সময় পর অভিযোগের ঝাঁপটা কমল। নরম নরম কথা হতে লাগল দুজনের মধ্যে।
প্রেমে আসলে কথা কিছু হয় না। মানে, কথার মধ্যে খসড়া বা গুরুত্ব কিছুই থাকে না। কিন্তু চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার আর পল্লবীরও ঠিক তেমনই চলছে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যত ফালতু আজগুবি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই হচ্ছে কথা। তবে বিরক্ত হচ্ছি না দুজনেই। বরং মজা লাগছে।
কত সময় গেছে জানি না। রাত ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অনেক অনেক দূরে খুব ক্ষীণভাবে বিয়েবাড়ির কোলাহল শুনতে পাচ্ছি। পরিবেশ ক্রমশ নিঝুম হচ্ছে। রাতচরা পাখিদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। কোথাও পেঁচা ইঁদুর ধরছে। আবার কোথাও শকুন গাছের মগডালে বসে ঝনঝন করে পাখা নাড়ছে। আমি পল্লবীর সঙ্গে কথাতে মেতে উঠেছি। দশদিক জুড়ে কী কী ঘটে চলেছে, সেদিকে তেমন চক্ষু বা কর্ণপাত করছি না আপাতত।
কথা বলতে বলতে কী মনে হল, সামনে ফাঁকা মাঠের দিকে তাকালাম— আনমনেই। ফোনের ওপাড় থেকে পল্লবী তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা কল্পকাহিনি শোনাচ্ছে। আমিও উৎসাহ নিয়ে তাতে সহযোগিতা করছি। তাই মাঠের দিকে তাকিয়েও আবার চোখ সরিয়ে নিলাম।
কিন্তু হুট করে মনে হল— কিছু একটা মাঠের মাঝখানে দেখলাম মনে হয়।
আবার তাকালাম।
হ্যাঁ, ঠিক। মাঠের মাঝখানে একটা বাছুর লাফাচ্ছে। ধবধবে সাদা বাছুর। একবার লাফিয়ে লাফিয়ে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে যাচ্ছে। আবার ডান দিক থেকে বাঁ দিকে আসছে। চাঁদের সাদা আলো সেই বাছুরের গায়ে পড়ে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। কী অপূর্ব! কী মায়াবী লাগছে বাছুরটাকে।
সমস্যা সেটা না। চিন্তার বিষয় হল, এত রাতে বাছুর এল কোথা থেকে? কার না কার বাড়ির গোয়াল থেকে পালিয়েছে বেচারা। আমি আবার কথাতে মন দিতে চাইলাম। কিন্তু মন যেন আর ফেরত আসছে না। সমস্ত আকর্ষণ, সমস্ত ধ্যান-ধারণা ওই বাছুরে গিয়ে পড়ছে বারবার। আমার থেকে বেশি দূরে না। হাত ত্রিশেক দূরে বাছুরটা তার কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। নেচে নেচে একবার ওদিকে যাচ্ছে, আবার একইভাবে এদিকে আসছে। স্নিগ্ধ চাঁদের আলোতে বাছুরটাকে লাগছে নরম মাখনের মতো। যেন হাত রাখলেই লোম কেটে শরীরে বসে যাবে।
অন্যদিকে বিপদ ঘটে গেছে। পল্লবী কী একটা প্রশ্ন করেছিল। আমি শুনতে পাইনি। আমি তখন বাছুরে মেতে ছিলাম। উত্তর না পেয়ে আপাতত পল্লবী অভিমানের সপ্তমে উঠে গেছে। গলায় কান্না জমা। আচ্ছা, মেয়েরা এত কাঁদে কেন? কাজ নেই, কর্ম নেই— পান থেকে চুন খসলেই কান্না। ফচ করে একটা কান্নার শব্দ পেলাম। জোর করেই মনকে পল্লবীর দিকে ঘোরাতে হল।
— কী বলছিলি যেন?
— কিছু না, যা।
— বল না। আমি শুনতে পাইনি। আসলে গ্রাম তো, টাওয়ারের বেজায় সমস্যা।
মিথ্যে বললাম। কী করে বোঝাব, মন কেড়েছে সামান্য একটা বাছুর। মাঝে মাঝে মিথ্যে অনেক কাজ দেয়।
সমস্যার গুরুত্ব পল্লবী বুঝেছে হয়তো। সে আবার বলল,
— আমি জিজ্ঞেস করছিলাম, কাল কী রঙের চুড়িদার পরে যাব?
— আমার যে রঙ পছন্দ, সেই রঙের যদি না থাকে।
— কিনে নেব।
— তাই নাকি! আচ্ছা, নীল রঙ ছিল ভীষণ প্রিয়।
— বুঝলাম মশাই।
— তবে হালকা না। গাঢ়। তোকে মানাবে না। এমনিতেই তোর দুধসাদা গায়ের রঙ। তাতে নীল রঙ বসলে কী হবে জানিস?
— কী হবে?
পল্লবীর গলা কেমন যেন মোলায়েম হয়ে গেছে।
আমি কথা বলতে বলতে তাকালাম বাছুরটার দিকে। সে খেলা থামিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গাঢ় কালো চোখ। চাঁদের আলো ঠিকরে চকচক করছে। অন্য কোথাও মন দেওয়াতে সে বিরক্ত। আমি তার দিকে তাকাতেই সে আবার লম্ফঝম্প শুরু করল। এবারেরটা আলাদা। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, এমন কিছু আছে তার খেলায়।
হঠাৎ আমার মনের মধ্যে থেকে কেউ যেন বলে উঠল—
"ফোনটা রাখ। বাছুরটাকে ধর।"
ফোনের ওপার থেকে পল্লবী বিরক্ত করছে আমাকে।
— কিরে, কী হবে বললি না তো?
আমি না জেনে, না বুঝে, ঘোরের মধ্যে বলে উঠলাম,
— বাছুর।
বলেই থতমত খেয়ে গেলাম।
ওদিকে পল্লবী অবাক হয়ে বলল,
— বাছুর! মানে?
বাছুরটা এবার তার লম্ফঝম্প আরও বাড়িয়েছে। কোনো কারণে সে বেজায় খুশি। সেদিকে তাকিয়ে থেকে আমি বললাম,
— জানিস তো, আমি যেখানে বসে আছি, সেখান থেকে কিছু দূরে একটা বাছুর এদিক-ওদিক ছুটছে। কী ধবধবে সাদা! কী কিউট!
— তুই যেখানে বসে আছিস মানে? তুই কি বিয়েবাড়িতে নেই?
— না। বিয়েবাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। মাসিদের ধানজমির ধারে বসে আছি।
— তোর সঙ্গে কে আছে?
— কেউ না তো। একা।
— ওখান থেকে মাসির বাড়ি কত দূর?
— অনেকটাই।
পল্লবী আচমকাই হন্তদন্ত হয়ে পড়ল। ধমকের স্বরে বলল,
— তুই কি পাগল হয়েছিস! এক্ষুনি ওঠ ওখান থেকে। এক্ষুনি!
এমন পাগলামো দেখে আমি কিছুটা অবাকই হলাম। ব্যাপার কী? হঠাৎ এমন ধমকাধমকি কেন?
আমি বললাম,
— কী হল? কী সুন্দর লাগছে এখানে। খামকা যাব কেন?
— আমি বললাম না! এক্ষুনি পালা ওখান থেকে। যত দ্রুত পারবি ছুট লাগা। আর ভুলেও পেছনের দিকে তাকাবি না।
এবার কথাটা মাথায় লাগল আমার। পেছনের দিকে তাকাবি না মানে?
— আরে, হয়েছেটা কী? বলবি তো নাকি?
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ও বলল,
— না মানে, গরমকাল। সাপখোপ বেরোতে পারে। তুই একা আছিস। কিছু বিপদ হলে কী হবে? কিরে, উঠলি?
পল্লবী কিছু একটা যেন চেপে গেল। মনটা খচখচ করছে।
আমি আদরের সুরে বললাম,
— আমাকে নিয়ে এত ভাবিস!
পল্লবী আবার যেন তাড়াহুড়ো শুরু করল।
— কিরে, উঠেছিস?
আমি চেয়ারে শব্দ করে উঠলাম। বাছুরটার দিকে তাকালাম। সে কিছুটা কাছে সরে এসেছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কী অপূর্ব মায়াবী লাগছে তাকে।
চেয়ারে শব্দ করতে করতে একই জায়গায় হাঁটতে লাগলাম, যাতে পল্লবী বুঝতে পারে যে আমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি।
এমন কিছু সময় পর পল্লবীকে বললাম,
— বিয়েবাড়ির সামনে চলে এসেছি। আজ আর কথা না। বাবা জানতে পারলে চপ্পল গোবরজলে চুবিয়ে চুবিয়ে মারবে।
আগামী দিনে কখন দেখা করব, ইত্যাদি কয়েকটা কথা বলে পল্লবী ফোন রেখে দিল।
আর আমি— পুনরায় আগের জায়গায় গিয়ে বসলাম।
বাছুরটা অনেক দূরে সরে গেছে। যেদিকে শ্মশান, ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় আগে তো আমার কাছেই এগিয়ে এসেছিল। আবার কোন অভিমানে দূরে সরে গেল? মন খারাপ লাগছে আমার। মাথার ভেতরে কেমন একটা ভোঁতা যন্ত্রণা করছে।
আচ্ছা, বাবা আমাকে এত ভালোবাসে, মা-ও। যদি আমি না থাকি, তাহলে কী হবে ওদের? আমার মৃত্যু কি মেনে নিতে পারবে? মানুষ খুব শক্ত জীব। সব মানিয়ে নিতে পারে। বাছুরটা সেই অনেক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানি না এসব কেন ভাবছি আমি। মরব কেন, এটাও বুঝতে পারছি না। তবে নিয়মের বাইরে বারবার মরার কথা মাথায় আসছে।
জীবনে সফলতা অনিশ্চিত, মান-সম্মান অনিশ্চিত, আদর-ভালোবাসা অনিশ্চিত। জীবনই তো অনিশ্চিত। কেবল সত্যি হল মৃত্যু। যার মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। ছাড় নেই, ফাঁকি নেই। আজ হোক বা অনেক দিন পর, সে সত্যি একদিন আত্মপ্রকাশ করবেই। তবে যদি আজ হয়, তাতে ক্ষতি কী?
এসব আমি কী ভাবছি? মরার কথাই বা ভাবছি কেন? অদ্ভুত ব্যাপার তো। চারিদিকের পরিবেশ নিঝুম হয়ে গেছে। বাতাস বইছে, গাছপালা নড়ছে, হয়তো শব্দও হচ্ছে। কিন্তু আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না। সব নীরব। কেউ যেন শাসন করে চলেছে তাদের। আমাকে বিরক্ত করতে না বলছে বারবার।
বাছুরটার খেলার ভঙ্গিতে বদল হয়েছে। দূর থেকে ছুটে ছুটে একবার আমার সামনে খুব কাছে এগিয়ে আসে। কিছু সময় স্থির হয়ে দাঁড়ায়। খানিক তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার তীরবেগে ছুটে শ্মশানের দিকে চলে যায়। আবার কিছু সময় পর সেখান থেকে তীরের মতো ছুটে আসে। আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আবার পালিয়ে যায়।
হঠাৎ একটা গন্ধ নাকে লাগল। চোখ বন্ধ হয়ে গেল আমার। সোঁদা মাটির নেশাতুর গন্ধ। নেশাগ্রস্ত লাগছে। কাঁচা কাঁচা মাটি তুলে খেতে ইচ্ছে করছে। গন্ধটা একটা ঝাপটা দিয়েই হারিয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে প্রবলভাবে। মাটিকে জলে ভিজিয়ে নাক ডোবাতে ইচ্ছে করছে। এ গন্ধ আমার চাই। তার জন্য সব ত্যাগ করতে রাজি আমি। এমনকি জীবনও।
হঠাৎ কে যেন বলে উঠল আমার ভেতরে—
"চল, ডোবার ধারে। কাদা মাটিতে ডুব দে। শান্তি পাবি।"
এবারে আর চমক এল না। যে কথা বলছে, ঠিকই তো বলছে। মাটি আর জল— দুই আদি উপাদান পৃথিবীর। এদের অমোঘ আবেদন ছিন্ন করা যায় নাকি!
আরও কিছু সময় গেল। ক্ষীণ যে কোলাহলের শব্দ আসছিল, তা স্তব্ধ হয়ে গেছে। চাঁদের ওপর মেঘ জমেছে। আলো পড়ছে, কিন্তু কেমন যেন অন্ধকার মেশানো। ঝিঁঝি পোকার শব্দ হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। রাত কত হল, কে জানে? জানতে ইচ্ছে করছে না। কেবল বাছুর আর আমি— যেন এই পৃথিবীর পরম দুটো অস্তিত্ব। বাকি সবকিছুই মূল্যহীন, অপ্রয়োজনীয়।
আমার শরীর হালকা লাগছে। অদ্ভুত এক আনন্দে মন কেমন করছে। সে আনন্দের ঝাঁঝ এতটাই যে মাথা, বুক, পেট ফাটিয়ে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি— একটা পচা ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে আছি। তাতে নানান রকমের মরা-পচা শরীর ভাসছে। তাদের শরীর থেকে কী তীব্র মাটির সোঁদা গন্ধ আসছে! পেছন থেকে কেউ যেন আমাকে ঠেলছে। ফেলে দিতে চাইছে সেই ডোবায়। জল থেকে কালো কালো কিছু আঙুল কিলবিল করছে। আমাকে ডাকছে যেন।
বাছুরটা তার মতোই খেলে চলেছে। সেই একইভাবে। একটুও আলাদা নয়। একবার পাশে আসে, আবার দূরে সরে যায়। যাওয়ার সময় যেন আমাকে নিয়ে যেতে চায়। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়ে আবার ফিরে আসে।
কত সময় বসে আছি জানি না। জানার ইচ্ছে-ও নেই। জীবন খুব নরম জায়গা। শান্তির বিছানা বানাতে যদি যুদ্ধ-সংগ্রাম করতে হয়, তো সে বিছানার মূল্য কী? কার জন্য সেই বিছানা? কে শোবে?
আমরা ছেলেরা আমাদের জন্যে বড্ড বেশি ভাবি। কিন্তু আমি কি কিছু পাই? আমাদের শান্তিকে আমার শান্তি ভাবি। কিন্তু আমি আর আমরা তো এক নই। আমি আলাদা। আমি হলাম কেবল আমি। আমার শরীর, আমার মন, আমার জীবন, আমার সুখ, আরাম, কষ্ট— যা একান্ত নিজস্ব। এখানে আমরা কে, কী অথবা কেন?
এবার তীব্র ইচ্ছে করছে বাছুরটাকে ধরার। ইচ্ছে করছে তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করার। তার পেছন পেছন শ্মশানধারে ডোবার কাছে চলে যাওয়ার। ভেজা মাটিতে নাক ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে থাকার। এটাই তো জীবন। এর জন্যেই তো আমার সৃষ্টি। এর বাইরে কোনো কিছুই তেমন গুরুত্ব রাখে না।
আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি। কলের গোড়া থেকে রস গড়াচ্ছে। বুঝতে পারছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না। বাছুরটা শ্মশানের দিকে চলে গেছে। সেখান থেকে আমাকে দেখছে। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম। এবার বাছুরটা আমার পাশে এলেই আমি তাকে জাপটে ধরব।
নিয়মমাফিক সে তীরবেগে আমার দিকে ছুটতে আরম্ভ করল। আমিও প্রস্তুত। চিতা যেমন আগুনের জন্য প্রস্তুত থাকে। আমার নাগালে এলেই লাফিয়ে পড়ব। যতক্ষণ না ধরা দিচ্ছে, হাল ছাড়ব না। সে ক্রমাগত কাছে আসছে। আমিও ডান পা মাটিতে গেঁথে রেখেছি। কোমর এখন চেয়ার থেকে কিছুটা উঠে আছে। বাছুরটা এগিয়ে আসছে ক্রমশ।
হঠাৎ থাবার মতো দুটো হাত আমার কাঁধে পড়ল। কেমন যেন তন্দ্রা থেকে চমকে বাস্তবে ফিরলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি নৃপেন মেসো। মেসো আমাকে একা এখানে দেখে অবাক।
বাছুরটা ছুটতে ছুটতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখ তার নিচের দিকে। রাগে গড়গড় করছে। মাটি কাঁপিয়ে সে তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে চারদিকে।
— তুই এখানে?
কথা বলতে পারছি না আমি। কিছু একটা যেন গলাকে আটকে রেখেছে। আমি হাতের ইশারায় দেখালাম বাছুরটাকে।
মেসো সেদিকে তাকিয়ে চমকে উঠল।
ঘড়ঘড়ে ভয়ের গলায় কিছু একটা যেন বলল—
— গোমুয়া!
তারপর ধুতি তুলে ছড়ছড় করে পেচ্ছাব করতে লাগল। পেচ্ছাব করতে করতে আমার সামনে একটা দাগ টানল যেন। বিড়বিড় করে কী সব উচ্চারণ করতে লাগল। আমি বুঝতে পারছি না, চলছে কী এসব!
কিছু প্রস্রাব আমার পায়ে পড়ল। হঠাৎ কী যেন হল, জানি না। আমার সব যেন মনে পড়ে গেল। বিয়েবাড়ি, পুটু, পল্লবী— ইত্যাদি।
মেসো আমার হাত ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে চলল। আমি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাছুরটাকে দেখতে চাইলাম। মেসো শক্ত করে আমার ঘাড় ধরে রেখেছে। কিছুতেই ঘোরাতে দিল না।
কানে কানে ফিসফিস করে বলল—
"শব্দভেদী বান,
ডমরু তার পরিধান।
শিবঠাকুর তার বর,
ভূত-প্রেত সব মর।"
জমিনবাড়ির দালানের কাছে মাদুরের একটা স্তুপ পড়েছিল। সেটাকে কাঁধে চাপিয়ে নিল। আমার হাত মেসোর হাতের মধ্যে। দাঁতে একটা হারিকেন ধরে রেখেছে মেসো। কারণ কোনো হাতই আর ফাঁকা নেই।
সেই আলোতে বাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম। পা যেন কেমন অবশ লাগছে। চলতে কষ্ট হচ্ছে। ঘুম পাচ্ছে আমার। খুব ঘুম।
অষ্টম পর্ব
বিয়ে বাড়িতে ফিরলাম। ওরে বাবা! এ যে ভোলবদল অবস্থা। চারদিকে টিউবলাইটের ছড়াছড়ি। জেনারেটর চলছে ঘটঘট করে। এবার বুঝলাম, মেসো জেনারেটরের তেল অবধি বুদ্ধি লাগিয়ে খরচ করেছে। নো বর তো নো আড়ম্বর।
বক্সে পরিষ্কার গান বাজছে—
“পৃথিবী ছাড়িয়ে মরু সাহারায়, মিশরের নীল নদ আকাশে মিলায়।”
ওদিকে বিয়ে দারুণ ভাবেই চলছে। আলোতে পৌঁছে ঠিক লাগছে নিজেকে। বাছুরের মতো একটা সামান্য জিনিস নিয়ে এত সময় ভেবেছি? হাসি পাচ্ছে।
মেসো আমাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। একটা জলের বোতল এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমি ঢকঢক করে জল খেতে লাগলাম। গলায় জল যেতেই বুঝলাম, গলা শুকিয়ে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল। জল যে এত আরামের, আগে কোনো দিন বুঝিনি। খাসি, রাবড়ি, দই, ইলিশ— এদের কাছে কিছুই না। এক বোতল জল নিমেষে শেষ হয়ে গেল।
কয়েকজন আমাকে দেখছে। মেসো তাদের ইশারা করল, আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করতে।
সেদিন যে কী বিপদের মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছিলাম, তা পরে জেনেছিলাম। কিছু দিন পর জানতে পারি, আমি গোমুয়া ভূতের খপ্পরে পড়েছিলাম। আর একচুল দেরি হলে আমাকে বাঁচানো যেত না।
গোমুয়া এক ধরনের মায়াবী ভূত। যে গরু পোয়াতি অবস্থায় মারা যায়, তাকে ভাগাড়ে ফেলার আগে তার পেট চিরে বাছুরটাকে বের করে দিতে হয়। নইলে সেই বাছুর গোমুয়া হয়ে যায়।
নির্জন ফাঁকা মাঠই তার আস্তানা। একা কাউকে পেলে এরা ফাঁদ পাতে। বাছুররূপে দেখা দেয়। কিছু সময় নাচানাচি করে, দৌড়ায়। লক্ষ্য এদের অন্য— সম্মোহন। একবার এদের পাল্লায় পড়ে গেলেই প্রথমে পেছনে পেছনে দৌড় করায়। ক্রমশ দূরে নিয়ে যেতে থাকে। একসময় ভুলিয়ে নিয়ে যায় ডোবা বা ঝিলের ধারে। তারপর সেখানে ডুবিয়ে...
পরে যখন এসব শুনলাম, আমি থ মেরে গিয়েছিলাম। ঐদিন নৃপেন মেস কিছুই বলেনি আনাকে। বললে হয়তো এই একই ভুল আবার করতাম না।
নৃপেন মেসো আমাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
আমিও একটা গজেন মার্কা ছেলে।যেখানে পল্লবীর চুল নাক গাল ঠোট নিয়ে কত কি বলা যেত।এমন নিরব মাঠ,নিসঙ্গ একাকি।যাই ইচ্ছে তাই করা যায়।আমি কিনা মেতে ছিলাম বাছুরে।মানে ইয়ার্কি চলছে।আসলে কিছু অভাগা যেদিকে চায়,সাগর শুকায়া যায়।আর আমি হলাম এক টাইপের অভাগা।যেদিকে সুযোগ যখনই পাই বাছুর ছুটে বেড়ায়।
যাই হোক, কিছু সময় গুম মেরে বসে থাকলাম।তারপর ধীরে ধীরে ধাতস্থ হতে লাগলাম। আমি কি ছাই তখন জানি যে, আমার সঙ্গে কী ঘটে গেছে।
নিজ চরিত্রমাফিক চারদিকে চোখ বোলালাম। বরযাত্রীর অবস্থা যেমন ভেবেছিলাম, ঠিক তেমন না। বরং আরও খারাপ। লুঙি, ধুতি, এমনকি বারমুডারও দেখা পেলাম। আসলে পুটুর বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে। গরমকাল। তাই যে যার মতো স্বাধীনতা প্রকাশ করেছে।
এদিক-ওদিক তাকাতেই চোখ পড়ল। একি! এ তো উর্বশী। এই পাঁকে তো এমন পদ্ম থাকা উচিত না। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, হাতে কী সুন্দর পশমের মতো বাদামি লোম। তাতে কালো বেল্টের ঘড়ি। মুখ যেন মায়া ধরানো। দেখলেই দেখতে ইচ্ছে করে, তাকিয়ে থাকতে। চুল এলোমেলো করে সাজানো। কেমন একটা ছন্দ আছে তাতে। ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক চিকচিক করছে। মেয়েটা আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল মনে হয়। আমি তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিল।
আচ্ছা! আমার সঙ্গে পাকামো! জানে তো না আমি কী জিনিস!
মাসির ছোট মেয়ে বিয়ের মণ্ডপে বরের পেছনে দাঁড়িয়ে গুলতানি মারছে। আঙুল দিয়ে চুটকি মারলাম। আমার দিকে তাকাল সে। আঙুলের ইশারায় তাচ্ছিল্যভরে ডাকলাম। সে কাছে এল। গম্ভীরভাবে আমার পাশে বসতে বললাম। সে বসল।
মেয়েটাকে দেখিয়ে আরও গম্ভীরভাবে বললাম—
— কে রে?
আমার উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছে সে। আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—
— যেই হোক, তুমি পটাতে পারবে না।
ধা করে মাথা গরম হয়ে গেল। আমি কী জিনিস, ও বোধহয় জানে না। পল্লবীকে নিয়েও কোনো এক বন্ধু এ কথা বলেছিল। আজ সে আমার হাতের মুঠোয়। আমি পটাতে পারি না, এমন কোনো মেয়েই জন্মায়নি। মাথায় জেদ চেপে গেল।
ওর কানে কানে বললাম—
— জুতা দেখেছিস?
— দেখেছি।
— মার খেয়েছিস?
— ছি দাদা, আমি তোমার বোন না। এভাবে বলতে আছে?
— তুই বললে ঠিক। আমি বললে ভুল। যদি ওর ফোন নম্বর আনি?
— পারবে না।
— যদি পারি?
— যদি না পারো?
— আমার নামে কুত্তা পুষবি।
— সম্ভব না।
— কেন?
— কারণ তোমার নামটা এতটাই ভালো না, যে কুত্তাকে দেব।
মাথা আবার গরম হয়ে গেল। ভালোই কথা শিখেছে তো।
কথার আদান-প্রদান কানে কানেই চলছিল। আমি কান টেনে ধরে বললাম—
— ওকে যদি পটিয়ে নিই?
— তুমি যা বলবে তাই।
— কবিতার ডায়েরি?
কিছুটা সময় ভাবল সে। তারপর হাসিমুখে বলল—
— ঠিক আছে।
মনে মনে হাসলাম। প্রথমে মেয়েটাকে পটাব। তারপর ওর কবিতার ডায়েরি এমন রসিয়ে রসিয়ে পড়ব, যে ও বুঝে নেবে কাকে চটিয়েছে।
চেয়ার ছেড়ে ধীরভাবে মেয়েটার পাশে গেলাম। মেয়েটা অন্য কারুর সঙ্গে কথা বলাতে ব্যস্ত। সাধারণ কুর্তি আর জিন্সে মেয়েটাকে অসাধারণ লাগছে।
গম্ভীরভাবে বললাম—
— যাক, কিছু তো কারণ পেলাম বিয়ে বাড়িতে থাকার।
মেয়েটি মুখ ঘোরাল।
— কিছু বলছেন?
অসম্ভব গম্ভীরভাবে তাকালাম। চোখ নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। তারপর চুপ। তেমন কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছি না আমি। পায়ের ওপর পা তুলে বিয়েতে মন দিলাম।
পুটু বিয়ের বেদি থেকে আমাকে দেখতে পেয়েছে। হেসে মাথা নাড়ল। আমিও নাড়ালাম।
মেয়েটা কেমন যেন উসখুস করছে। হাতে কিছু ফুল ধরা আছে। মালাবদলের সময় ছুড়বে মনে হয়।
এবার আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। ক্ষীণভাবে অবজ্ঞার হাসি দিলাম।
কিছু সময় এভাবেই কাটল।
মেয়েটি বলল—
— পাত্রীর কে হন আপনি?
মেয়েটার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম। তারপর চোখ সরিয়ে নিলাম। যেন এই খেজুরে আলাপে আমি বিরক্ত।
মেয়েটিও চুপ। কেমন কাঁচুমাচু হয়ে গেছে।
আরও কিছু সময় গেল। তারপর বললাম—
— সুন্দরীদের অভিমানী মুখ তাদের আরও সুন্দর করে তোলে।
মেয়েটি আর কথা বলছে না। ধনুকের মতো ভ্রু দুটো কুঁচকে মণ্ডপের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ গম্ভীর। আমাকে বুঝতে পারছে না। তাই চটাতেও চাইছে না।
ম্লান হাসি দিলাম। তারপর বললাম—
— যেচে পরিচয় করতে এসে ল্যালপামো করলে কি ভালো লাগত?
মেয়েটি এখনও তাকাচ্ছে না। মন দিয়ে বিয়ে দেখছে। তবে গম্ভীর মুখটা কিছুটা শিথিল হল। অল্প হাসির রেখা ফুটে উঠেছে ঠোঁটে।
আমি সিনেমার কায়দায় বললাম—
— বাই দ্য ওয়ে, অর্পণ।
মেয়েটি বেশ ঢঙ করে তাকাল। চোখে আধুনিক করে কাজল মাখানো। খুব সাধারণ, কিন্তু শিক্ষিত সাজ। খারাপ লাগছে না বটে। কিন্তু পল্লবীর মতো না। পল্লবী একশোতে একশো দশ পেলে, একে একশো দেওয়া চলে।
হাসির রেখা এবার আরও স্পষ্ট।
— তৃষা।
আগে যদি জানতাম, এ আসবে, তাহলে মাঠে বসে বাছুরের নাচ দেখতাম না।
এরপর আর কী! তেল, ঝাল, নুন মাখিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে নিলাম।কেবল নম্বর নিলে হয়তো পরের ঘটনা আসত না।গল্প এখানেই শেষ হয়ে যেত।কিন্তু গল্প দেবীর অন্য লক্ষ্য ছিল মনে হয়।তৃষার সঙ্গে এরপর কথা চলতে লাগল।প্রথম আলাপে কথা সাধারনত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।তাই রাতে কথা বলে তা সম্পূর্ণ করা হবে,দুজনে এই পরিকল্পনাও নিলাম।
খাসি যে এমন হবে, ভাবতেও পারিনি। ভাগ্যিস মেস বিয়ে করাতে ব্যস্ত। নইলে কেবল আমার খাওয়া দেখেই নাগা সন্ন্যাসী হয়ে ইহমায়া ত্যাগ করত। সে খাওয়া মানে জীবনের বাজি রেখে খাওয়া।
উফ, কী নেই! কাতলা কালিয়া, ভেটকি পাতুরি, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, খাসি— আর যা যা হয়।
তৃষা আমার পাশেই বসে খেল। খাওয়া-দাওয়া সেরে ও বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। বুঝলাম, ওর যেতে ইচ্ছে নেই। কিন্তু বাবা-মা চলে গেলে একা থাকতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়েই যেতে হল। এই বাবা-মা গুলো বড় শত্রু।
বিয়ে বাড়ির বাইরে ইশারায় ডেকে আনলাম তাকে। একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে কিছু কথা বললাম। কিছু সময় পর সে চলে গেল। আর রাতে ফোন করবে জানিয়ে গেল।
আমি পড়লাম বিপাকে। কথা বলব কোথায়? ঘরভর্তি লোক। মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। রাতটা জমিনবাড়িতে কাটালে কেমন হয়? কারেন্ট, বিছানা— সবই তো আছে। সমস্যা কোথায়!
নবম পর্ব
কিছু নিয়ম আগে থেকেই বানানো থাকে। তাকে ভাঙা যায় না।
ক্লান্তিভাব নিয়ে মাসির কাছে গেলাম। বললাম—
— ঘুম পাচ্ছে।
মাসি মন খারাপ করে দালানে বসেছিল। সে অবস্থায় ফ্যাকাসে গলায় বলল—
— উপরে চলে যা। বিছানা করা আছে, বাবা।
আমি একটু ইতস্তত করলাম।
— মাসি, এত কোলাহলে কি ঘুমাতে পারব?
— একটু কষ্ট করে নে, বাবা...
আরও কিছু বলতে চাইছিল হয়তো। কিন্তু কান্নার জলে শব্দগুলো ভেসে গেল।
আমি বললাম—
— মাসি, জমিনবাড়িতে চলে যাব? নিরিবিলিতে ঘুমানো যাবে।
— ভয় লাগবে না তো?
— না না। ভয় কেন লাগবে!
— যা তাহলে। ভয় লাগলে চলে আসিস।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। কথায় কথা বাড়ে, আবার নতুন সমাধানও বের হয়। পাছে জমিনবাড়ির থেকে ভালো কোনো উপায় মাসি বের করে দেয়— এই ভয়ে তাড়াতাড়ি পালিয়ে এলাম। মেয়ে পরের দিন শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। এক কষ্ট এখন প্রবল। আমার ঘুমানো নিয়ে মাসির মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এই ভালো, কিছু কাজ করতে হয় সবার আড়ালে।
চাবি কাছেই ছিল। জমিনবাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম।
আমার রাতযাপন একটু আড়ম্বরপূর্ণ হয়। বালিশ, কোলবালিশ, গায়ে দেওয়ার কম্বল আর দু-বোতল জল লাগে। একটা বোতলেই হয়ে যায়। অপরটা ব্যাকআপ। একে একে সব জোগাড় করলাম। তারপর রওনা দিলাম জমিনবাড়ির দিকে।
রাত অনেকটাই হয়েছে। বারোটা প্রায় বাজতে চলল। গ্রামবাংলায় এখন নিশুতি রাত। ভূত-প্রেত, ব্রহ্মদৈত্যগণ আড়মোড়া দিয়ে নিদ্রাভঙ্গ করে। বাকি রাতটুকু ধরে ভয় দেখানো বা ঘাড় মটকানোর কাজ চালাবে কিনা।
তৃষার আগমনে আমার প্রেমতৃষ্ণা তুঙ্গে উঠেছে। সব কিছু পুরোটা পেতে নেই। কিছু সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থাকলেই ভালো লাগে। তৃষাও তাই। কিছু গল্প, কাঁচা বা আধপাকা ভালো লাগাই যথেষ্ট। তারপর রাত শেষ। সম্পর্কেরও "বল দুগ্গা মায়ে কি" বলে মনের কোনো এক কোণায় বিসর্জন দিতে হবে।
লটাকম্বল চাপিয়ে চললাম আমি। রাস্তা, বাঁশবন যে নতুন করে ভয় দেখাচ্ছে না, তা নয়। তখনও তো জানতাম না, সেই বাছুর আসলে গোমুয়া ভূত। তাই আর ভয়ও লাগছে না। কেবল মনে হচ্ছে, কখন তৃষা ফোন করবে আর আমি কথার জাদুতে তাকে বশ করব। এই ধরনের খেলাতেই আসল মজা। তবে বেশি কথা বলা যাবে না। ভোর ভোর বিছানা ছাড়তে হবে। তারপর হোস্টেল। তারপর পল্লবীর প্লাবন।
জমিনবাড়ির সামনে গিয়ে তাকালাম ফাঁকা মাঠের দিকে। বাছুরটা আছে কি? না, কিছু নেই। নৃপেন মেসো কেন যে হুট করে প্রস্রাব করল, কেনই বা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল, বুঝতে পারলাম না। চেয়ারখানা আগের মতোই পড়ে আছে সেখানে। ইচ্ছে করছে, এই চেয়ারেই বসে বসে তৃষার সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু শরীর এবার জবাব দিচ্ছে। ক্লান্ত লাগছে। অগত্যা বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম।
ঠকঠাক করে সুইচ টিপে বুঝলাম, বাল্ব কেটে গেছে। আচ্ছা, মজা! একটা সিলিং ফ্যান আছে। সেটা ঘুরছে, ঠান্ডা বাতাস চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বিছানা করে নিলাম। বালিশ-টালিশ ঠিক করে পেতে নিলাম। তারপর মাঠের দিকের জানালা হাট করে খুলে দিলাম। একঝাঁক কুয়াশা-মেশানো ভেজা বাতাস লাফিয়ে ঘরে ঢুকল। তৃষাকে আগে ফোন করা যাবে না। তাতে আমার ইমেজ খারাপ হবে। বরং তৃষারই ফোনের অপেক্ষা করতে হবে। আমি বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
চাঁদের মেজাজ আবার বেশ ফুরফুরে হয়ে গেছে। অবশ্য তা কতক্ষণ থাকবে, বোঝা যাচ্ছে না। মেঘের একটা দলা খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সেদিকে। আমি বেশ কিছু সময় ধরে তাকিয়ে আছি। কেমন একটা ঘুমঘুম ভাব ভিড় করছে চোখের অলিগলিতে। মোবাইল দেখলাম। তিনটে নড়বড়ে টাওয়ার। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, কে জানে। হয়তো সে ফোনই করবে না। হয়তো আমি ঘুমিয়ে যাব।
শরীর ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। ঘুমের একটা স্রোত মনকে অবশ করে ক্রমেই উঠে আসছে। সময় তখন সাড়ে বারোটা ছাড়িয়ে গেছে। ফোনটা রেখে আবার জানালা দিয়ে তাকালাম। মেঘ অনেকটা কাছে চলে এসেছে চাঁদের। এই ঝাঁপিয়ে পড়ল বলে।
জানালা দিয়ে খোলা মাঠ দেখা যাচ্ছে। সেও আমার মতো নীরব। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মনে হয়। সব কিছু শান্ত। গাছের পাতারাও অবসন্নভাবে নড়ছে। আমি খুব ধীরে ধীরে নিজের সত্তা হারাচ্ছি। মনের এদিক-ওদিক বন্যার জলের মতো যে ঢেউগুলো ধেয়ে আসছে, তারা তন্দ্রা নয়— নিরেট, গাঢ় ঘুম। চোখের পাতা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি জোর করে খুলে রেখেছি। যতক্ষণ শরীরে বল আছে, লড়াই চালিয়ে যাব।
এর পর আর কিছু মনে নেই।
দশম পর্ব
অনেক দূরে মোমবাতি জ্বলছে। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার। সেই মোমবাতির দিকে তাকিয়ে বসে আছি। পাশে পল্লবী। তার হাতে একটা গামলা। সে কিছু একটা মাখছে তাতে। লাল রঙের কিছু লেগে আছে তার হাতে। হাত দিয়ে চটকে চটকে মাখছে সে। আমি দেখার চেষ্টা করছি, কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কিছু সময় মাখার পর একটা দলা হাতে করে এগিয়ে আনল আমার মুখের দিকে। একি! তার হাতে... তার হাতে... খাসির মাংস আর মুড়ি। বিয়ে বাড়িতে যেমন হয়েছিল। লাল লাল, ঝাল ঝাল। মুড়ির মধ্যে থেকে এক টুকরো মাংস দেখা যাচ্ছে। সাদা চর্বি লেগে আছে তাতে। আমি ইয়া বড় একটা হাঁ করলাম। তার হাত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। হঠাৎ ঝপ করে মোমবাতি নিভে গেল। চারিদিকে নিকষ অন্ধকার। আমি মুখ হা করেই বসে আছি। জিভ নেড়ে নেড়ে দেখছি মাংস-মুড়ি মুখে ঢুকেছে কিনা। না! কোথায় মুড়ি! কোথায় পল্লবী! কেউ তো নেই। আমি একা। হাত-পা নাড়তে পারছি না। কেউ যেন আমাকে বেঁধে রেখেছে। আমি ছটফট করছি।
একি! শুয়ে আছি কেন? আ... আমি তো বসে ছিলাম। মাংস-মুড়ি খাব খাব করছিলাম। কিন্তু আমার বুকের ওপর ওটা কি! তীব্র ভয়ে গা-হাত-পা কেঁপে উঠল। কে বসে আছে আমার বুকের ওপর? নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে কেন? আরে! এ তো আমার গলা টিপে ধরেছে। হঠাৎ পল্লবীকে দেখতে পেলাম অন্ধকারে। তার এক হাতে সেই মুড়ির গামলা, অন্য হাতে খুন্তি। ক্রমাগত শাসাচ্ছে তাকে— "গলা টিপে ধরলে ও মুড়ি খাবে কি করে?"
হঠাৎ অনেক দূর থেকে একটা পরিচিত শব্দ হল। খুব চেনা চেনা লাগছে। তারপর আচমকা মনে পড়ল— এ তো আমার ফোনের রিংটোন। স্ক্রিনে কোথা থেকে লেখা ভেসে আসছে— তৃষা। আমি হাত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি ফোন ধরার জন্য। কিন্তু পারছি না। ওদিকে গলাটা আরও জোরে টিপে ধরল কেউ। সেই অবস্থাতেই পল্লবী মাংস-মুড়ি জোর করে ঢোকাচ্ছে মুখে। কষ্ট হচ্ছে, তা সত্ত্বেও খেতে ভালো লাগছে। ওদিকে ফোন ক্রমাগত কর্কশভাবে বেজেই চলেছে।
বিরাট বড় একটা ঢেকুর তুলে জেগে উঠলাম। সত্যিই ফোন বাজছে। গলার চাপটা এক নিমেষে অনেকটা হালকা হয়ে গেল।গ্যাস হয়ে গেছে ভয়ানক ভাবে।
ফুল রিং হয়ে শান্ত হয়ে গেল ফোন। একটা বেজে গেছে সময়ের। চারিদিকে কোনো শব্দ নেই। কারেন্ট চলে গেছে কখন কে জানে। তবে গরম লাগছে না। জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস লাফিয়ে ঢুকছে।
ফোন হাতে নিলাম। ফোন লাগিয়ে দিলাম। কয়েকটা রিং হতেই ফোন ধরল তৃষা।
— ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বুঝি?
— একটু।
— ইস, জাগিয়ে দিলাম!
— হুম।
— বিরক্ত হচ্ছেন?
গভীর একটা নিশ্বাস ছাড়লাম। যার মানে হ্যাঁ-ও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। তৃষা আবার বলল—
— রেখে দেব?
আমি একটু থামলাম। তারপর বললাম—
— হুম।
ওদিকে চুপ। শুধু নিশ্বাসের শব্দ হচ্ছে। কিছু সময় এভাবেই কাটল। ফোন ধরাই আছে। আবার তৃষা বলল—
— জেগে আছেন?
— হুম।
— কিছু বলছেন না যে?
— শুনছি।
— কী?
— নিশ্বাসের শব্দ।
— কার?
— তোমার।
— ওমা! কেন?
— আচ্ছা, আমরা সব কথা কি কেবল মুখ দিয়েই বলি? তুমি কি জান, আমরা আমাদের শরীর দিয়ে মুখের থেকেও অনেক অনেক বেশি ভাব আদান-প্রদান করি?
— জানতাম না তো।
— সেই ভাষা যারা পড়তে পারে, তাদের অজানা কিছু নেই। তাদের কেউ ঠকাতে পারে না। তাদের আমরা অলৌকিক ক্ষমতাধারী বলে চিনি।
— তাই নাকি? আপনি পড়তে পারেন?
— চেষ্টা করি।
— কী বুঝলেন তাহলে আমার নিশ্বাসের শব্দ নিয়ে পড়াশোনা করে?
বুঝলাম, ব্যঙ্গ করছে। আমি সটান বলে দিলাম—
— তোমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ কোনো কারণে তুমি খুব আপসেট। তোমার মনে হচ্ছে, তুমি কোনো ভুল করনি। কিন্তু কেউ তোমাকে বারবার দোষ দিচ্ছে। তুমি আমাকে সেই কথাটা বলতে চাও। আসলে তুমি নিজেই যাচাই করতে চাইছ, তুমি সত্যিই দোষী কিনা। সম্ভবত একটা ছেলে... মনে হচ্ছে, সে তোমাকে পছন্দ করে। তুমিও কর। কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারছ না।
তৃষা অবাক। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না।
ধারাবাহিকভাবে একের পর এক যুক্তি দিয়ে এই খসড়া বানানো হয়েছে। যেমন, মাসির মেয়ে বলেছিল— ওকে পটাতে পারবে না। কিন্তু পটাতে কই বেগ পেতে হল! অর্থাৎ, সে কথা বলতে চাইছিল। কথা সে অনেকের সঙ্গেই বলতে পারে। আমাকে বাছল কেন? মানে, এমন কিছু কথা আছে যা সবাইকে বলা যায় না। তাই প্রথমেই প্রেমের সম্ভাবনা মাথায় এল। তবে প্রেম এখনও হয়নি। হলে রাতে এভাবে ফোন করার সাহস পেত না। আর দোষারোপ? মেয়েরা নিজেদের দোষ সহজে মানতে চায় না। কেউ দোষ দিলেই সেটাকে খণ্ডন করার জন্য প্রাণপণ লেগে যায়।
— কী, মিলল আমার কথা?
একাদশ পর্ব
ফুল রিং হয়ে শান্ত হয়ে গেল ফোন। একটা বেজে গেছে সময়ের। চারিদিকে কোনো শব্দ নেই। কারেন্ট চলে গেছে কখন কে জানে। তবে গরম লাগছে না। জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস লাফিয়ে ঢুকছে।
ফোন হাতে নিলাম। ফোন লাগিয়ে দিলাম। কয়েকটা রিং হতেই ফোন ধরল তৃষা।
— ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বুঝি?
— একটু।
— ইস! জাগিয়ে দিলাম!
— হুম।
— বিরক্ত হচ্ছেন?
গভীর একটা নিশ্বাস ছাড়লাম। যার মানে হ্যাঁ-ও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।
তৃষা আবার বলল—
— রেখে দেব?
আমি একটু থামলাম। তারপর বললাম—
— হুম।
ওদিকে চুপ। নিশ্বাসের শব্দ হচ্ছে। কিছু সময় এভাবেই কাটল। ফোন ধরাই আছে।
আবার তৃষা বলল—
— জেগে আছেন?
— হুম।
— কিছু বলছেন না যে?
— শুনছি।
— কী?
— নিশ্বাসের শব্দ।
— কার?
— তোমার।
— ওমা, কেন?
— আচ্ছা, আমরা সব কথা কি কেবল মুখ দিয়েই বলি? তুমি কি জান, আমরা আমাদের শরীর দিয়ে মুখের থেকেও অনেক, অনেক বেশি ভাব আদান-প্রদান করি?
— জানতাম না তো।
— সেই ভাষা যারা পড়তে পারে, তাদের অজানা কিছু নেই। তাদের কেউ ঠকাতে পারে না। তাদের আমরা অলৌকিক ক্ষমতাধারী বলে চিনি।
— তাই নাকি? আপনি পড়তে পারেন?
— চেষ্টা করি।
— কী বুঝলেন তাহলে আমার নিশ্বাসের শব্দ নিয়ে পড়াশোনা করে?
বুঝলাম ব্যঙ্গ করছে। আমি সটান বলে দিলাম—
— তোমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ কোনো কারণে তুমি খুব আপসেট। তোমার মনে হচ্ছে, তুমি কোনো ভুল করনি। কিন্তু কেউ তোমাকে বারবার দোষ দিচ্ছে। তুমি আমাকে সেই কথা বলতে চাও। আসলে তুমি দোষী কিনা যাচাই করতে চাও। সম্ভবত ছেলে। মনে হচ্ছে, তোমাকে সে পছন্দ করে। তুমিও কর। কিন্তু কেউ কাউকে বলতে পারছ না।
তৃষা অবাক। কথা বেরোচ্ছে না তার মুখ দিয়ে।
আমি কিন্তু আন্দাজে বলিনি এসব। ধারাবাহিকভাবে একের পর এক যুক্তি দিয়ে এ খসড়া বানানো হয়েছে। এই যেমন মাসির মেয়ে বলেছিল— ওকে পটাতে পারবে না। কিন্তু পটাতে কই বেগ পেতে হল না। অর্থাৎ সে কথা বলতে চাইছে। কথা সে অনেকের সঙ্গেই বলতে পারে। আমাকে বাছার কী হল? মানে এমন কারও কথা বা কিছু কথা বলতে চাইছে, যা সবাইকে বলা যায় না। মানে প্রেমিক। তবে প্রেম হয়নি। কারণ তা হলে রাতে ফোন করার সাহস পেত না। আর দোষারোপ? মেয়েরা তাদের দোষ কোনো দিনই মানতে চায় না। দোষ দিলেই হল। সেই আরোপকে খণ্ডবিখণ্ড করার জন্য সে ভগবানের সঙ্গেও লড়াই করতে পারে।
— কী, মিলল?
নিশ্বাসের শব্দ ভারী হয়ে গেল ওর। কিছু সময় এভাবেই কাটল। আমিও চুপ। যেচে কথা বলব না।
— আপনি এত কিছু বুঝলেন কীভাবে?
— ওই শরীরের ভাষা, বা নিশ্বাসের রিদম।
— বাবারে! এ কার সঙ্গে কথা বলছি আমি?
হাঁসলাম আমি।
এই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রচ্ছন্নভাবে আমি যে এলেবেলে নই, তা কথার ফাঁকফোকরে বুঝিয়ে দিতে লাগলাম।
কথা বলে বুঝলাম, মেয়েটি কলকাতার কোনো এক কলেজে ল-এর ছাত্রী। কারিগর আজ আইনকে ধরাশায়ী করেছে। এবার বুঝলাম, এ লুঙি-ধুতির মাঝে এ রাজরানীর উৎপত্তি কী করে হল! কলকাতার জল।
কথাবার্তা বেশ কিছু সময় ধরে চলছে। আমার আত্মকেন্দ্রিক আস্ফালন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ক্রমাগত।
হঠাৎ তৃষা বলল—
— বিয়ে কি শেষ হয়েছে?
— ঠিক বলতে পারব না। আসলে আমি তো ওখানে নেই।
— কোথায় আছেন তাহলে?
— মাসিদের ধানজমির পাশে যে বাড়িটা আছে, সেখানে।
— মানে জমিনবাড়িতে, একা?
আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললাম—
— হ্যাঁ।
— এত নির্জনে, একা। আপনার ভয় লাগছে না?
— ভয় কেন লাগবে? আর কাকেই বা লাগবে? You mean ভূত-প্রেত?
— তাছাড়া আর কী? গ্রামবাংলা মানেই তো ভূতের পাইকারি দোকান।
আমি হা হা হা করে হেসে উঠলাম। তারপর বললাম—
— For your kind information, Madam, I don't believe in ghosts. And I'm never afraid.
কথাগুলো বাংলায় বলা যেত। কিন্তু ইংরেজিতে বললে গুরুত্ব বাড়ে।
এর উত্তরে মেয়েটা কয়েক মিনিট ধরে ইংরেজিতে কী সব বলে গেল। একদম সাবলীলভাবে। কিছু বুঝতে পারলাম, আবার কিছু ফসকে গেল। ইয়া ইয়া করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এরপর ইংরেজিতে বেশি দূর না এগিয়ে বাংলাতেই ফিরতে হল।
এবারে আমি গিয়ে পড়লাম আমার সাহসিকতা নিয়ে।
কথার মাঝে তৃষা বলল—
— সত্যি করে বলুন তো, আপনি জমিনবাড়িতে একা আছেন?
— মিথ্যে বলে আমার লাভ?
— ইমপ্রেশন ক্রিয়েট করা।
— কার কাছে?
এমনভাবে তাচ্ছিল্য করে বললাম, যে কারও গায়ে লেগে যাবে।
— আমি হলে জীবনেও ওই ঘরে একা থাকার সাহস করতে পারতাম না। আচ্ছা, মানে কিছু কি অনুভব করছেন?
— কী অনুভব করব?
— পাখা চলছে?
— না। কারেন্ট নেই।
— সর্বনাশ!
কপাল কুঁচকে উঠল আমার। "সর্বনাশ" উচ্চারণের মধ্যে কিছু একটা আছে। কারেন্ট, না অন্য কিছু? পল্লবীর মতো মনে হল, এ-ও কিছু চেপে যাচ্ছে।
আমি পাখার দিকে একবার তাকালাম। বাতাসে মৃদুভাবে এদিক-ওদিক দুলছে।
তৃষা আবার বলল—
— পাখার দিকে তাকান একবার।
— তাকিয়েই আছি।
— কিছু বুঝতে পারছেন?
— না।
— জমিনবাড়ির ব্যাপারে কিছু শোনেননি?
এবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কী বলতে চাইছে মেয়েটা? আমি ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেছি। কিন্তু বুঝতে দিলাম না।
ঝরঝরে গলায় বললাম—
— কী শুনব?
— এখন না। পরে কোনো একদিন বলব। একা আছেন, ভয় পাবেন।
আমি মনে মনে বললাম, সেই ভালো। সাহস দেখাতে গিয়ে ভিরমি খাওয়ার কোনো মানেই হয় না।
মেয়েটা আবার বলল—
— আপনাকে কুর্নিশ, মশাই। একা এই ঘরে রাত কাটাবেন।
গলা শুকিয়ে আসছে। চারদিক থেকে অন্ধকার যেন হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরতে চাইছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। পাখার দুলুনিতে ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ হচ্ছে।
আমি আবার পাখার দিকে তাকালাম। এবার ভয় ভয় লাগছে।
ওকে বললাম—
— আমার ভয়ডর কিছুটা কম। জীবনে একদিনই ভয় পেয়েছিলাম।
— কবে?
— আজ।
— কেন?
— ভেবেছিলাম তুমি পাত্তা দেবে না।
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। পল্লবীর মতো সুন্দর নয় বটে, কিন্তু শুনতে মন্দ লাগে না। এমনভাবেই রসাল কথা ছুড়ে মেরে ঘায়েল করতে হয় মেয়েদের।
— আপনার যে ভয়ডর কম, সেটা আমি জানি।
— কীভাবে জানলে?
— মেয়েরাও অনেক কিছু দেখেই বুঝে নেয়।
— তাই বুঝি?
— হুম, একদম তাই। আপনি যদি ভিতু হতেন, এই বাড়িতে একা রাত কাটাতে আসতেন না। জানেন কি, মাস দুয়েক আগে ওই পাখাতেই গলায় ফাঁস নিয়ে একজন মহিলা আত্মহত্যা করেছিল।
আমি উঠে বসলাম। আচমকা আঘাতে আমি হকচকিয়ে গেলাম। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মোবাইল কানে রাখতে সমস্যা হচ্ছে। কারণ প্রবল বেগে আমার হাত কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শব্দ বেরোচ্ছে না সেখান থেকে।
ওদিক থেকে গলা এল—
— এরপরও এই ঘরে তুমি থাকবে?
'আপনি' থেকে 'তুমি'-তে নেমেছে মেয়ে। কিন্তু আমি সে আবেগ আর ধরতে পারছি না।
কষ্ট হলেও আত্মবিশ্বাসী গলায় বললাম—
— অবশ্যই থাকব। বললাম না, আমার সাহসের ব্যাপারে তোর ধারণা কম আছে।
কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালাম। অন্ধকার। কেবল অন্ধকার।
আমি শব্দ না করে খাট থেকে নামলাম। মেঝেতে পা দিতে ভয় আরও জাপটে ধরল। খাটের নিচে কেউ কি বসে আছে? পায়ে জিভ বোলাবে বলে জিভটা এগিয়ে আনছে? না হাত বাড়াচ্ছে? পা ধরে টেনে খাটের নিচে ঢুকিয়ে নেবে বলে?
বেডকভার তুলে গলায় জড়িয়ে নিলাম।
তৃষা বলতে লাগল—
— অন্য কেউ হলে পরি কি মরি করে পালাত।
— আমাকে আর চিনলে কতটা!
এক বগলে পাশবালিশ, অন্য বগলে মাথার বালিশ গোঁজা হয়ে গেছে আপাতত।
তৃষা বলল—
— সত্যি মানছি। আমি আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বেশি সাহসী ছেলের সঙ্গে কথা বলছি।
— সাহসের কী দেখলে! নেহাত ভোরে আমাকে চলে যেতে হবে। নাহলে এই ঘরই আমার আস্তানা হত। আসলে কী জান, তৃষা— ভয়ের মধ্যে একরকমের আনন্দ থাকে, যাকে বারবার পেতে ইচ্ছে করে। রোলার কোস্টার বল বা বানজি জাম্পিং। ভয় লাগে বলেই আনন্দ লাগে।
বলতে বলতেই দরজা খুলে একপ্রকার লাফিয়ে বেরিয়ে এলাম। ওদিকে তৃষা নানান প্রশংসায় একূল ভাসিয়ে দিচ্ছে। আমি সাবলীলভাবে সব উত্তর দিচ্ছি। তবে ভয় যে কী আর কেমন, তা সবকিছু দিয়েই অনুভব করছি।
বাড়ির বাইরে এসে পড়লাম নতুন ফ্যাসাদে। এবার যাব কোথায়? ফিরে গেলে মাসি ভাববে ভয় পেয়েছি। আর এখানে থাকা! ঘরের দিকে তাকানোই যাচ্ছে না।
হঠাৎ চারদিকে শেয়াল ডেকে উঠল। মানে বলব কী আর! এমনিতেই কানা, তার ওপর আবার কালো চশমা। বাইরে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছি। আবার তৃষার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথাও বলছি।
অগত্যা পুকুরের বাঁধানো ঘাটের দিকে এগিয়ে গেলাম। বিছানা পাতলাম। কিন্তু হায় ভগবান! জলের বোতল তো জমিনবাড়িতেই ফেলে এসেছি। এবার কী করব? যাব? অসম্ভব। কিন্তু গলা যে শুকিয়ে ফাটা মাটি হয়ে গেছে।
জোরে একটা নিশ্বাস নিলাম। পুকুরে আদিম মানুষের মতো মুখ লাগিয়ে চো চো করে প্রাণভরে জল খেয়ে নিলাম।
আকাশের নিচে পাতা বিছানায় শুয়ে আছি। কানে ফোন। একে কাটা যাবে না। এই বিপদে তৃষাই একমাত্র সঙ্গী। যতক্ষণ না ঘুমে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই, কথা চালিয়ে যেতে হবে।
বিপদের কী শেষ আছে? এবার তৃষা হাই তুলল। সর্বনাশ! ভয়ে আমার ঘুম কেটে গেছে।
যা ভেবেছি তাই। কিছু সময় পর তৃষা পরিত্রাণ চাইল। আমার মাথা গেল ঘুরে। এ ফোন কেটে দিলে আমি ভয়েই মরে পড়ব। ঘড়িতে দেখি দুটো বেজে পাঁচ মিনিট। আমি নানান কথার ছলে তাকে জাগিয়ে রাখলাম। রাত অনেক বাকি এখনও।
মনে মনে বললাম— এই যাত্রায় যদি বেঁচে ফিরি, জীবনে আর বিয়েবাড়িতে যাব না।
তিনটে বাজল। তৃষা আর চোখ খুলে রাখতে পারছে না। বারবার আমাকে অনুরোধ করছে। আমি নাছোড়বান্দা। আরেকটু, আরেকটু করে জাগিয়ে রাখছি তাকে। সাড়ে তিনটার পর আমার চোখেও ঢুলুনি এল। শরীর আর ধকল নিতে পারছে না।
এই সেই শুভক্ষণ।
তৃষাকে বিদায় দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
দ্বাদশ পর্ব
ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম, শিশির স্নান করিয়ে দিয়েছে। শেরওয়ানি ভিজে চুপসে শরীরে লেপ্টে আছে। কটা বাজে এখন? হাতঘড়ি দেখলাম। ছটা পঞ্চান্ন। গলা ব্যথা করছে। হাত-পায়েও খুব যন্ত্রণা। উঠে বসতে গেলাম। মাথা বনবন করে ঘুরে গেল। কোনোমতে উঠে এলোমেলো পায়ে মাসির বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।
বাড়িতে কন্যাবিদায় পর্ব এইমাত্র ঘটে গেছে। সবাই কাঁদছে। মাকেও কাঁদতে দেখলাম। মা কেন কাঁদছে?
আমি সটান চলে গেলাম মাসির কাছে। প্রায় চিৎকার করে উঠলাম—
— তোমাদের কাণ্ডজ্ঞান কি? ওই ঘরে একজন মহিলা আত্মহত্যা করেছে, তাও আমাকে শুতে পাঠালে?
মাসি কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। সেই জলভরা চোখে মিটমিট করে তাকাল। চোখে বিস্তর অবাক ভাব। কান্না আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিরাও আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আত্মহত্যা—কন্যাবিদায়ের চেয়েও মজাদার টপিক চলে এসেছে। তাই সবাই এতে মন দিয়েছে।
মা দেরি না করে এগিয়ে এসে আমার গায়ে হাত দিল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।
— আত্মহত্যা? কে আত্মহত্যা করবে? স্বপ্ন দেখেছিস মনে হয়।
ঝাঁ করে মাথা ঘুরে গেল। বুঝলাম, তৃষা সাধারণ মেয়ে না। কোন প্যাঁচে কোন ঘা দিতে হয়, সে জানে। একাকিত্বের সুযোগ নিয়ে দারুণ চাল চালেছে।
মাথা আর স্থির রাখতে পারছিলাম না। শরীর অবশ হয়ে পড়েছে। নেতিয়ে পড়লাম।
তারপর আর কিছুই মনে নেই।
Comments
Post a Comment