মুখচোরা
কারণ আমি মুখচোরা ছেলে।
তবে এর কুফলের চেয়ে সুফলই বেশি। পড়াশোনার অনেক সময় পাওয়া যায়। কোনো ফিস্ট বা জন্মদিনের পার্টিতে ডাক পাই না। ইচ্ছে যে করে না তা ঠিক নয়, কিন্তু 'আমায় ডাকলি না কেন?'—এই প্রশ্ন করার জন্য যে শক্তি লাগে, সেটাই জোগাড় করতে পারি না। খারাপ লাগে, তবে সব খারাপ কেবল খারাপ হয় না; তাতে অনেক কিছু ভালোও থাকে। যখন বন্ধুদের দল সারপ্রাইজ গিফট নিয়ে আলোচনা করে আমার পাশেই বসে, আমি তো ওদের কাছে 'পড়তি মাল'। তাই আমায় নিয়ে ভাবার সময় কারও থাকে না। আমারও যে কষ্ট হয়, তা তারা বুঝতে পারে না। থাক, বললাম না তো—সব খারাপ সব সময় খারাপ হয় না। আমি তখন অঙ্ক করতে বসে যাই। মাধ্যমিক আসছে তো, এক যন্ত্রণাকে ডুবিয়ে দিই অন্য সমস্যায়। বন্ধুরা হাসে, নোংরা কিছু খিস্তি মারে। জানি না, সেটাই ভালো লেগে যায়। অন্তত ওদের চোখে তো পড়লাম!
তারপর অদ্ভুতভাবে এলো সেই দিনটা। একদিন বাড়িতে রাগ করে স্কুলে চলে এসেছি। রাগ ঠিক নয়, রাগ-মিশ্রিত অভিমান টাইপের কিছু একটা জেগে উঠেছিল আমার মধ্যে। বাবা ভাইয়ের জন্য স্পাইডারম্যানের ছবি লাগানো কী সুন্দর একটা টি-শার্ট কিনে এনেছেন। অবশ্য কয়েক দিন ধরে ভাই-ই জেদ ধরে বাড়ি মাথায় তুলেছিল। আমি কোনো দিনও বাবার কাছে কিছু চাইনি, কেমন যেন লজ্জা লাগে। আমার জন্য কিছুই আনেননি বাবা, ভাইয়ের জন্য আনলেন। কেমন যেন অভিমান চেপে বসল বুকে। কান্না পেয়ে গেল। স্নান করার নাম করে বাথরুমে গিয়ে অনেকটা কাঁদলাম। তারপর খাওয়ার টেবিলে বসে এমন ভাব করলাম যেন খেতে ইচ্ছে নেই। প্রবল অভিমানের এক গোপন প্রতিবাদ। টিফিন বক্সটাও বাড়িতে ইচ্ছে করে ফেলে এলাম। কোনোমতে পালিয়ে এসেছিলাম স্কুলে। কেমন মজা দেখো—কেউই বুঝল না, কিন্তু প্রতিবাদ হয়ে গেল।
বিপদ যে ঘটে গেছে বুঝলাম যখন টিফিন ব্রেক হলো। তপ্ত রোদের মতো পেট ফাটানো খিদে টের পেলাম। উফ, কী অসহ্য! আমি খিদে সহ্য করতে পারি না। খিদে পেলে দুনিয়া আবছা হয়ে যায়। ঠিক এই সময় দুনিয়ার সব খাবার মনে পড়ে যায়, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আমি অঙ্কে মন দিলাম জোর কদমে। জানতে হবে, বুঝতে হবে—সমস্যা সব জায়গায়, এবং তা আমার খিদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি ভয়ানক।
আমি হয়তো মন দিয়েই ফেলেছিলাম, কিন্তু হঠাৎ কী হলো জানি না। এক অনবদ্য অপূর্ব সুন্দর গন্ধ ভেসে এল আমার নাকে। পেন থমকে গেল আমার।
আমি তাকালাম তোমার দিকে। তুমি আমার পাশের ডেস্কে বসেছিলে। নিজের টিফিন খুলেছ সবে। কী জানি কেমন সবুজ রঙের সস মেশাচ্ছিলে তোমার চাউমিনে। আমি একনজরে তাকিয়ে ছিলাম। কয়েক কুচি মাংস যেন এদিক-ওদিক দিয়ে নড়ে নড়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল। চোখ ভরে কান্না এল। খিদে এমন মারাত্মক হতে পারে বুঝিনি। আগে যদি বুঝতাম, তবে সব রাগকে অনশন-প্রতিবাদের বাইরেই রাখতাম।
আমি তাকালাম তোমার দিকে। তুমি আমার পাশের ডেস্কে বসেছিলে। নিজের টিফিন খুলেছ সবে। কী জানি কেমন সবুজ রঙের সস মেশাচ্ছিলে তোমার চাউমিনে। আমি একনজরে তাকিয়ে ছিলাম। কয়েক কুচি মাংস যেন এদিক-ওদিক দিয়ে নড়ে নড়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল। চোখ ভরে কান্না এল। খিদে এমন মারাত্মক হতে পারে বুঝিনি। আগে যদি বুঝতাম, তবে সব রাগকে অনশন-প্রতিবাদের বাইরেই রাখতাম।
হয়তো একটু বেশি সময় নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম তোমার চাউমিন মাখানোর দিকে। আসলে আমার কাণ্ডজ্ঞান ছিল না কিনা। তুমি আচমকা তাকালে আমার দিকে—আচমকা না অনেক সময় ধরে তাকিয়ে ছিলে, জানি না। কারণ খিদেতে আমি তখন জ্ঞানহারা। যখন বুঝলাম তুমি তাকিয়ে আছ,ফট করে আমি চোখ ঘুরিয়ে নিলাম। আবার অঙ্কে মন দিলাম। মন যে এত অপরিচিত জিনিস, তা জানতাম না। আমার মন আমারই আয়ত্তে নেই। সে তখন সেই চাউমিনের মাংস কুচির মতো এদিক-ওদিক নড়াচড়া করছে। হঠাৎ আমার অঙ্ক বইয়ের পাশে এগিয়ে এল তোমার টিফিন ক্যারিয়ারের চাপা। তাতে কিছুটা চাউমিন। আমি তাকালাম। কেমন অদ্ভুত লাগল তোমাকে। তুমি চামচ দিয়ে একমনে খাচ্ছিলে। আমিও কেমন সব ভুলে গিয়েছিলাম। সত্যি বলছি, সব পারি আমি, কিন্তু খিদে সহ্য করতে পারি না। আমিও খাওয়া শুরু করলাম। প্রতিটি গ্রাসে মাংস মুখে পড়ছিল। তুমি কি তাহলে বেছে বেছে আমায় বেশি মাংস দিয়েছ? অত ভাবার সময় নেই, কারণ আমায় তখন খেতে হবে।
খেতে খেতে জানি না কী হলো, তাকালাম তোমার দিকে। তুমি একমনে গালে হাত দিয়ে বসে আমার খাওয়া দেখছ। সত্যি বলছি, বিশ্বাস করো—তোমাকে দেখে সেই ক্ষণে, সেই মুহূর্তে, সেই লহমায় নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল। তোমার মুখে যেন নিজের মায়ের মুখ দেখতে পেলাম। বুক ভরে কান্না এল। কান্না হয়তো চোখ ছাপিয়ে আসত, কিন্তু তখনো তুমি তাকিয়ে আছ আমার দিকে। আমি সব সময় একাই কাঁদি, কারও সামনে কান্না পেলেও আমি চেপে যাই।
আমি এই প্রথম কারও দিকে এত মনোযোগ সহকারে তাকালাম নিজের মা ছাড়া। কেমন যেন এক অবিচ্ছিন্ন স্নেহ তোমার মুখের প্রতিটি কোণে জেগে উঠেছে। আমি তাকাতেই তুমি কেমন করে যেন হাসলে। লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিলাম আমি। মুখ নামিয়েই খালি টিফিন ক্যারিয়ারের ঢাকনাটা এগিয়ে দিলাম তোমার দিকে।
তারপর কী হলো জানি না। বাড়িতে গিয়ে মাকে খুব আস্তে আস্তে বললাম, "মা, কালকে চিকেন চাউমিন করে দেবে? আমি টিফিনে নিয়ে যাব।" মা তো অবাক! বলে কী ছেলে! যে ছেলে জীবনে কিছুই চায়নি, সে ছেলে এক ধাক্কায় চিকেন চাউমিন! মা বলল, "ব্যাপার কী রে? হঠাৎ চিকেন চাউমিন!" আমি চুপ করে গেলাম। মাথা নামিয়ে নিলাম। মা হয়তো জানে এরপর কোনোভাবেই আর কথা বলানো যাবে না আমায় দিয়ে। তাই আর কিছুই বলল না। সেদিন আর পড়াশোনা হলো না। শুধু ভাবছিলাম সেই মুখটা। কেমন যেন কিছু একটা আছে, যা ভালো লেগে যায়। আমার মতো মুখচোরা ছেলেদের যেন সেই মুখের দিকে তাকিয়ে গড়গড়িয়ে সব বলে যেতে ইচ্ছে করে। তুমি ফর্সা না কালো, মোটা না রোগা, সুন্দরী না কুৎসিত—আমি জানি না, জানতে চাইও না। শারীরিক সৌন্দর্যের বাইরে গিয়ে অন্য কিছু, অন্য কোনো স্নিগ্ধতা যেন প্রতিপত্তি বিস্তার করেছে তোমায় জুড়ে। স্নেহের সেই রাজ্য বিস্তারের লড়াইয়ে অসহায় হয়ে অস্ত্র সমর্পণ করতে ইচ্ছে করে তোমার সামনে। সেই সমর্পণ যেন এক অপরিচিত জগতের শান্তি বয়ে আনে।
চাউমিন তো নিলাম, কিন্তু সমস্যা হলো দেব কীভাবে? কী বলেই বা দেব? 'তুই' বলব না 'তুমি' না 'আপনি'? আমার পাশের ডেস্কে আজ যে তুমিই বসবে, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? যদি না বসো? আমার থেকে অনেক দূরে যদি তোমার অবস্থান হয়? এতগুলো মেয়েদের ডেস্ক পেরিয়ে তোমার কাছে যেতে হবে—এ কি সোজা ব্যাপার! স্কুল বাসের জানালার ধারে বসে বসে তাই ভাবছিলাম। মাঝে মাঝে ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দেখছিলাম চাউমিন গরম আছে তো।
তুমি আমার পাশের ডেস্কেই বসেছিলে, আমার থেকে মাত্র এক হাত দূরে। জীবনের প্রথম সেই দিন বুঝলাম—সরলরৈখিক পদ্ধতিতে মাপা দূরত্ব কেবল বিজ্ঞানের নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের মন, আবেগ ও অনুভূতির জগতে সেই নিয়ম অন্য রকমের।
তুমি আমার পাশের ডেস্কেই বসেছিলে, আমার থেকে মাত্র এক হাত দূরে। জীবনের প্রথম সেই দিন বুঝলাম—সরলরৈখিক পদ্ধতিতে মাপা দূরত্ব কেবল বিজ্ঞানের নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের মন, আবেগ ও অনুভূতির জগতে সেই নিয়ম অন্য রকমের।
তুমি আমার পাশেই বসেছিলে। যথা সময়ে টিফিন ব্রেকও হলো। কিন্তু তোমাকে তোমার মতো করে টিফিন ক্যারিয়ারের ঢাকনাতে কিছু চাউমিন এগিয়ে দিতে পারলাম না আমি। কেমন যেন আটকে গিয়েছিল সব। আসলে মুখচোরা ছেলে কি না! কত কী বলতে চেয়েও বলতে পারি না। একবারও তো বলতে পারলাম না—'খাও, আমার মা রান্না করে দিয়েছে।' বারবার মাথা নিচু করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে একাই খাওয়া শুরু করে দিলাম পুরো চাউমিন। তুমি সেদিন বাটার টোস্ট নিয়ে এসেছিলে। কী সুন্দর করে খাচ্ছিলে! আমি মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলাম তোমার দিকে। তুমিও মাঝে একবার তাকিয়েছিলে আমার দিকে, লজ্জায় আমি মাথা নিচু করে নিয়েছিলাম।
হঠাৎ আমায় এক টুকরো রুটি এগিয়ে দিলে। আর আমিও তোমার দিকে এগিয়ে দিলাম চাউমিন—মাংস বেছে বেছে। আমার মাংস বাছা দেখছিলে তুমি। তোমার জন্য আলাদা করে একটা কাঁটাচামচও এনেছিলাম। সব সমেত এগিয়ে দিলাম তোমার সামনে। তুমি কেমন তৃপ্তি করে খেলে সব। আমিও খেলাম।
এর পর শুরু হলো দেওয়া বাদে শুধুই নেওয়া। কালি নেই দেখে এগিয়ে দিতে তোমার পেন। জ্যামিতি বাক্স আনিনি বলে নিজের জ্যামিতি বাক্স এগিয়ে দিয়ে নিজে মার খেতে স্যারের কাছে। আমারও ইচ্ছে করত তোমায় কিছু দেব। কিন্তু দেবটাই বা কী? সেই চিন্তাটাই ছিল আমার চেনা সীমার বাইরে। এই পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, তা-ই তোমায় দিতে ইচ্ছে করত। কিন্তু আমি মুখচোরা ছেলে। তোমায় কিছু দিতে হলে কারও কাছ থেকে তো নিতে হবে তা, কিন্তু আমি যে চাইতে পারি না!
সব কেমন যেন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলছিল। তারপর হঠাৎ করে তুমি স্কুলে আসা বন্ধ করলে। এক দিন, দু দিন, তিন দিনের মাথায় সব অসহ্য হয়ে উঠল। জোর করেই অঙ্কে মন ডোবাতাম। তোমার অনুপস্থিতি আমার চেতনার প্লবতা বলকে যেন বাড়িয়ে দিয়েছিল—মন অঙ্কে ডুবতেই চাইত না, বারবার যেন ভেসে ভেসে উঠত।
এরপর যা হওয়ার তাই হলো। আমি গিয়ে হাজির হলাম তোমার বাড়িতে। কত তদন্ত করে তোমার বাড়ির সন্ধান পেয়েছিলাম, তুমি ভাবতেও পারবে না। কাউকে তো জিজ্ঞাসা করতে পারব না, কারণ তুমি জানো—আমি মুখচোরা।
দুরু দুরু বুক আর নিভু নিভু সাহস নিয়ে তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। বিকেলের পড়ন্ত রোদে আকাশ যেন লাল হয়ে ছিল। তোমার মায়ের চোখে পড়লাম আমি। "কী চাই ছেলে? এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন?" বলাতেই মনে হচ্ছিল ঘোড়ার মতো ছুটে পালাই। তা আমি করতেই পারতাম, কিন্তু তাহলে তোমার ব্যাপারে আর জানা হতো না। তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই বললাম। বলেই যেন গর্ব হলো নিজের ওপর। আসলে মানুষ প্রয়োজনের কাছে সব সময় নিজের গর্বের আত্মাহুতি দিয়ে এসেছে। আমিও দিলাম, কারণ আমার খুব প্রয়োজন—তোমাকে দেখা আমার খুব প্রয়োজন।
তোমার মা আমায় ভেতরে নিয়ে গেলেন। তুমি কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে ছিলে। তোমার শরীর খারাপ। আমায় আসতে দেখে যেন একটু হাসলে। সেই হাসি! সত্যি বলছি, তোমায় এভাবে অসহায়ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে আমার কেমন যেন লাগল। তুমি কেন অসহায় হবে? তুমি হবে আমার জীবনের শক্তি, আমার উৎসাহ, আমার পরম অনুপ্রেরণা। আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছিলাম তোমায়। বুকের ভেতরে এক অব্যক্ত অসহ্য কষ্ট হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল নিজের জমানো সব পুণ্য ভগবানের কাছে জমা রেখে তোমায় ভালো করে দেওয়ার চুক্তি করি।
আমি গিয়ে বসলাম তোমার বিছানার পাশের চেয়ারে। তুমি খানিক উঠে বসার চেষ্টা করলে, পারলে না। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছিল—থাক না, তুমি যেভাবেই আছ সেভাবেই চুপটি করে শুয়ে থাকো। পারলাম না। মাথা নিচু করে চুপটি করে বসে থাকলাম শুধু। তুমিও কিছু বললে না। তোমার মা চা দিলেন, ম্যাগি বানিয়ে দিলেন। আমি সব নিপুণভাবে খেলাম। এমনভাবেই মন দিয়ে খেলাম যেন তোমার বাড়িতে আমি খেতেই গেছি। খেতে খেতে তাকালাম একবার তোমার দিকে। তুমি বিছানায় হেলান দিয়ে সেই গালে হাত দিয়ে আমার খাওয়া দেখছ। এতদিন দেখিনি তোমার গলায় একটা তিল আছে। দেখবই বা কী করে, টাইয়ের ফাঁস আঁটা থাকত যে আমাদের গলায়। অন্ধকার আকাশে যেমন ছোট ছোট তারারা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে, তেমনিভাবে তিলটা যেন জেগে আছে তোমায় জুড়ে। অনেক সময় তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল সেই তিলটার দিকে, কিন্তু পারলাম না। চোখ নামিয়ে নিলাম।
চুপটি করে অনেক সময় বসে ছিলাম। তুমিও চুপ করে ছিলে। বাইরের প্রকৃতি বিকেল মাড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে এগোচ্ছে। কালো অন্ধকারগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে উড়ে আসছে জানালা দিয়ে। এবার ফিরতে হবে। কেমন যেন করে উঠল মন। সারাজীবন কি এভাবে বসে থাকা যায় না? চুপচাপ, বুক জোড়ানো আবেগকে প্রাণপণে চেপে রেখে। এই প্রকৃতির নিয়ম বড় জটিল, বড়ই অস্বচ্ছ, বড়ই অসহ্য।
চলে আসার আগের মুহূর্তে তাকালাম তোমার দিকে। তুমি কেমন করে যেন তাকিয়ে আছ। পাতলা লাল ঠোঁটে চেপে আছে কেমন একটা হাসি। আমায় দেখে মজা পাচ্ছিলে, তাই না? আমি হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা রাস্তায় নেমে এলাম।
বাড়ি ফিরে কী হলো জানি না, বই নিয়ে বসলাম। আমায় পড়তে হবে, আরও পড়তে হবে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন আনন্দে ভরে উঠেছে। সেই অপার্থিব আনন্দকে আমি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারব না। যেন কিছু একটা অত্যন্ত ক্ষমতাধারী অনুভূতি বুকের ভেতরে হঠাৎ জেগে উঠেছে। এবং জেগে উঠেই সেই অনুভূতি শরীরের প্রতিটি কোণায় কোণায় এক পবিত্রতা দিয়ে ভরে দিচ্ছে।
আমি খারাপ কিছু ভাবতে পারছি না। খারাপ কোনো কাজ করা যেন অসম্ভব লাগছে। তাই আমায় পড়তে হবে। যদিও ক্লাসের প্রথম হই আমি, কিন্তু তার বাইরে গিয়েও আমায় আরও অনেক কিছু অর্জন করতে হবে। সেই শক্তিধারী অনুভূতি আমায় স্থির থাকতে দেবে না, এগিয়ে নিয়ে যাবে—আর আমায় যেতেই হবে।
আমার ভেতরে আলাদা কিছু একটা হয়েছে, যা এতদিনকার পরিচিত সবকিছুর থেকে আলাদা। আরও কিছুদিন স্কুলে অদ্ভুতভাবে কাটল। ভালো লাগত না। বিশ্বাস করো, কিছুই ভালো লাগত না। আমি সে সময় জমিয়ে অঙ্ক করে নিতাম। অঙ্কগুলোও হয়ে যেত সহজে, তাতে আরও বিরক্তি লাগত। জটিল ভাবনা নিয়ে যে মনকে ব্যস্ত রাখব, তাও হতো না।
এভাবে কাটল কিছু দিন। প্রায়ই নিয়ে যেতাম চিকেন চাউমিন। ভাবতাম আজ তুমি আসবে, আবার ভাগাভাগি করে খাব দুজনে। কিন্তু তুমি আসতে না। আমি একাই খেয়ে নিতাম।
তারপর একদিন ব্যাগে মাথা এলিয়ে শুয়ে ছিলাম। কী মনে হতেই তাকালাম ক্লাসে ঢোকার দরজার দিকে। দেখি তুমি এসে দাঁড়িয়েছ। সেই ঘিয়ে রঙের স্কার্ট, খয়েরি জামা ইন করা। ঘিয়ে রঙের টাইটা আঁটা তোমার গলায়। তিলটা দেখা যাচ্ছে না, না দেখা যাক—কিন্তু আমি বিপুলভাবে চমকে গিয়েছিলাম। ঝড়ের মতো কিছু আনন্দের বাতাস যেন বয়ে এল আমার দিকে। তোমার মুখটাও কেমন শান্ত। ঠোঁটের কোণে সেই হাসি। আমার দিকে তাকিয়ে হাসছ তুমি। আমিও হাসতে গেলাম কিন্তু পারলাম না। কিন্তু একটা ব্যাপার ঘটে গেল—চোখে চোখ আটকে গেল। আমি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছি না। আমার চোখ যেন তোমার চোখে আটকে গেছে। সেই বড় বড় চোখ, তাতে এক নিস্তব্ধ দুষ্টুমি যেন আমায় বোঝাচ্ছে—"এই তো, আমি এসেছি।"
তুমি এসে আমার পাশের ডেস্কে বসলে। কী যে আনন্দ হচ্ছিল, কী বলব! আনন্দে আমি অঙ্ক নিয়ে বসলাম। সমাধান আমায় করতেই হবে। এই পৃথিবীর সব জটিল হিসেবগুলোকে ধরে বেঁধে আমার আয়ত্তে আনতেই হবে। প্রাণভরে যেন আজ হাসতে ইচ্ছে করছে। আমি হাসতে চাইছি কিন্তু পারছি না, অভ্যাস নেই তো!
এভাবে কাটল কিছু দিন। প্রায়ই নিয়ে যেতাম চিকেন চাউমিন। ভাবতাম আজ তুমি আসবে, আবার ভাগাভাগি করে খাব দুজনে। কিন্তু তুমি আসতে না। আমি একাই খেয়ে নিতাম।
তারপর একদিন ব্যাগে মাথা এলিয়ে শুয়ে ছিলাম। কী মনে হতেই তাকালাম ক্লাসে ঢোকার দরজার দিকে। দেখি তুমি এসে দাঁড়িয়েছ। সেই ঘিয়ে রঙের স্কার্ট, খয়েরি জামা ইন করা। ঘিয়ে রঙের টাইটা আঁটা তোমার গলায়। তিলটা দেখা যাচ্ছে না, না দেখা যাক—কিন্তু আমি বিপুলভাবে চমকে গিয়েছিলাম। ঝড়ের মতো কিছু আনন্দের বাতাস যেন বয়ে এল আমার দিকে। তোমার মুখটাও কেমন শান্ত। ঠোঁটের কোণে সেই হাসি। আমার দিকে তাকিয়ে হাসছ তুমি। আমিও হাসতে গেলাম কিন্তু পারলাম না। কিন্তু একটা ব্যাপার ঘটে গেল—চোখে চোখ আটকে গেল। আমি কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছি না। আমার চোখ যেন তোমার চোখে আটকে গেছে। সেই বড় বড় চোখ, তাতে এক নিস্তব্ধ দুষ্টুমি যেন আমায় বোঝাচ্ছে—"এই তো, আমি এসেছি।"
তুমি এসে আমার পাশের ডেস্কে বসলে। কী যে আনন্দ হচ্ছিল, কী বলব! আনন্দে আমি অঙ্ক নিয়ে বসলাম। সমাধান আমায় করতেই হবে। এই পৃথিবীর সব জটিল হিসেবগুলোকে ধরে বেঁধে আমার আয়ত্তে আনতেই হবে। প্রাণভরে যেন আজ হাসতে ইচ্ছে করছে। আমি হাসতে চাইছি কিন্তু পারছি না, অভ্যাস নেই তো!
ছুটির পর আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে তুমি। আমার ব্যাগের ওপর একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো উড়ে এসে পড়ল তোমার হাত থেকে। কাগজ খুলে দেখার সময় কই! স্কুল বাস ছেড়ে দিলে ফেরা মুশকিল হয়ে পড়বে। বিশ্বাস করো, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিল—কেমন আছ তুমি? তোমায় কেমন যেন দুর্বল, ক্লান্ত লাগছিল। সেরকম হলে আমি না হয় পিছু পিছু হেঁটে গিয়ে তোমায় তোমার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে পারতাম। কাজটা করতে খুব ইচ্ছে করছিল।
স্কুল গেট পেরিয়ে স্কুল বাসে উঠতে যাব, এমন সময় দেখি তুমি স্কুলের পাশের ফুচকা দোকানে দাঁড়িয়ে আছ। তাকিয়ে আছ আমার দিকে। আমি বাসে উঠে গেলাম। জানালার ধারে গিয়ে বসলাম। জানালা দিয়ে তোমায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তুমি কেমন করুণভাবে দেখছ আমায়। আমি একনাগাড়ে তাকাতে পারছি না, বারবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছিলাম। সেই কাগজের ভাঁজটা খুললাম। তাতে লেখা—'আমি ভালো আছি। আজ ফুচকা খাওয়ার নেমন্তন্ন থাকল।' ফুচকা জিনিসটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। একবার খেয়ে বুঝেছিলাম, এই পৃথিবীতে সবকিছু সবার জন্য বানানো হয়নি। তারপর ওই বস্তুর প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিলাম। তোমার মুখ স্থির ও গম্ভীর, চোখগুলো যেন হতাশায় ভারাক্রান্ত। কীভাবে যে বোঝাই তোমায়—ফুচকা খেতে গেলে স্কুল বাস ছেড়ে যাবে, বাড়ি ফিরব কী করে? তারপর চমক দিয়ে যেন তন্দ্রা কাটল। তোমার স্কুল বাস তো ছেড়ে গেছে! তুমি বাড়ি ফিরবে কীভাবে? ততক্ষণে আমার বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠেছে। তোমার চোখ যেন আরও করুণ হয়ে উঠল। আমি নিজের সিট থেকে উঠে পড়লাম। আমি বুঝে গেছি—আজ তোমার নিরাপত্তার ভার তুমি দিচ্ছ আমায়। বাস তখন মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করেছে। গেট আগলে দাঁড়িয়েছে বাস কাকা। গেটের কাছে গেলাম। বাস কাকা বলল, "কী ব্যাপার?" আমি মাথা নামিয়ে নিলাম। ধীর, ক্লান্ত ও অবসন্ন পায়ে এসে নিজের সিটে বসলাম।
স্কুল গেট পেরিয়ে স্কুল বাসে উঠতে যাব, এমন সময় দেখি তুমি স্কুলের পাশের ফুচকা দোকানে দাঁড়িয়ে আছ। তাকিয়ে আছ আমার দিকে। আমি বাসে উঠে গেলাম। জানালার ধারে গিয়ে বসলাম। জানালা দিয়ে তোমায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তুমি কেমন করুণভাবে দেখছ আমায়। আমি একনাগাড়ে তাকাতে পারছি না, বারবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছিলাম। সেই কাগজের ভাঁজটা খুললাম। তাতে লেখা—'আমি ভালো আছি। আজ ফুচকা খাওয়ার নেমন্তন্ন থাকল।' ফুচকা জিনিসটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। একবার খেয়ে বুঝেছিলাম, এই পৃথিবীতে সবকিছু সবার জন্য বানানো হয়নি। তারপর ওই বস্তুর প্রতি আগ্রহ হারিয়েছিলাম। তোমার মুখ স্থির ও গম্ভীর, চোখগুলো যেন হতাশায় ভারাক্রান্ত। কীভাবে যে বোঝাই তোমায়—ফুচকা খেতে গেলে স্কুল বাস ছেড়ে যাবে, বাড়ি ফিরব কী করে? তারপর চমক দিয়ে যেন তন্দ্রা কাটল। তোমার স্কুল বাস তো ছেড়ে গেছে! তুমি বাড়ি ফিরবে কীভাবে? ততক্ষণে আমার বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠেছে। তোমার চোখ যেন আরও করুণ হয়ে উঠল। আমি নিজের সিট থেকে উঠে পড়লাম। আমি বুঝে গেছি—আজ তোমার নিরাপত্তার ভার তুমি দিচ্ছ আমায়। বাস তখন মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করেছে। গেট আগলে দাঁড়িয়েছে বাস কাকা। গেটের কাছে গেলাম। বাস কাকা বলল, "কী ব্যাপার?" আমি মাথা নামিয়ে নিলাম। ধীর, ক্লান্ত ও অবসন্ন পায়ে এসে নিজের সিটে বসলাম।
পরের দিন ক্লাসে মাথা নিচু করে ঢুকে বুঝলাম অনেক কিছু ঘটে গেছে। আমার পাশের ডেস্কটা ফাঁকা। তুমি এসেছ বটে, কিন্তু বসেছ অনেক দূরে। চোখ ভেঙে কান্না এল। তুমি তাকিয়ে ছিলে আমার দিকে। ভাঙাচোরা মুখ নিয়ে কোনোমতে ব্যাগটা নিজের ডেস্কে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে গেলাম বাথরুমে। দরজা বন্ধ করে হু হু করে কাঁদলাম। হয়তো ক্লাসেই কেঁদে ফেলতাম, কিন্তু সবার সামনে কাঁদতে পারি না কি না, লজ্জা করে। অনেক সময় নিয়ে প্রাণভরে কাঁদলাম, তাও যন্ত্রণা কিছুতেই কমছে না। বুকের ভেতরে শক্ত মতো কিছু যেন আটকে আছে—ভারী কিছু একটা। এত ভারী যে বুক চিবড়ে দিচ্ছে বারবার।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে যখন ক্লাসে এলাম, তখন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। দরজায় এসে দাঁড়াতে স্যার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। সঙ্গে বাকিরাও। আমি একবার আমার পাশের ডেস্কের দিকে তাকালাম—তুমি ওখানে বসে নেই। কেমন ভয়ানক অভিমান হলো যেন। স্যারের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকলাম। স্যার আমার শারীরিক অবস্থা নিয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, আমি কোনো উত্তর দিলাম না। নিজের ডেস্কে ব্যাগে মাথা এলিয়ে পড়লাম। নিদারুণ অভিমান জমেছে বুকে। তোমার জন্য, তোমাকে ঘিরে পাক খাচ্ছে সেই অনুযোগ। কেন তুমি দূরে যাবে? কেন গিয়ে বসবে অন্য জায়গায়? নাম-না-জানার জগতে বেনামি হয়ে কি পরম আপন হয়ে থাকা যায় না? বলো যায় না কি? আমার চির নীরবতার মধ্যে অজানা ভাষা হয়ে আমার মধ্যে নিজেকে কি দেখতে পাওয়া যায় না? কেন যায় না? আমি তো পারি। অঙ্ক আটকালে তোমাকে মনে করি। একনাগাড়ে অনেক সময় ধরে ভাবি তোমায়—ধ্যান হয়ে যায়, ভালো লাগার ধ্যান। তুমিই তো আমার শক্তি, আমার উদ্দীপনা, আমার ফিকে হয়ে যাওয়া বন্ধুহীন জীবনের একচিলতে আলোকবিন্দু।
সেই ধ্যানের পর যেন মনে হয় পৃথিবী অনেক সহজ জায়গা, অঙ্কগুলোও। আর তোমাকে কেমন যেন খুব কাছের লাগে—আমার মায়ের মতো কাছের মানুষ।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে যখন ক্লাসে এলাম, তখন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। দরজায় এসে দাঁড়াতে স্যার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন। সঙ্গে বাকিরাও। আমি একবার আমার পাশের ডেস্কের দিকে তাকালাম—তুমি ওখানে বসে নেই। কেমন ভয়ানক অভিমান হলো যেন। স্যারের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকলাম। স্যার আমার শারীরিক অবস্থা নিয়ে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, আমি কোনো উত্তর দিলাম না। নিজের ডেস্কে ব্যাগে মাথা এলিয়ে পড়লাম। নিদারুণ অভিমান জমেছে বুকে। তোমার জন্য, তোমাকে ঘিরে পাক খাচ্ছে সেই অনুযোগ। কেন তুমি দূরে যাবে? কেন গিয়ে বসবে অন্য জায়গায়? নাম-না-জানার জগতে বেনামি হয়ে কি পরম আপন হয়ে থাকা যায় না? বলো যায় না কি? আমার চির নীরবতার মধ্যে অজানা ভাষা হয়ে আমার মধ্যে নিজেকে কি দেখতে পাওয়া যায় না? কেন যায় না? আমি তো পারি। অঙ্ক আটকালে তোমাকে মনে করি। একনাগাড়ে অনেক সময় ধরে ভাবি তোমায়—ধ্যান হয়ে যায়, ভালো লাগার ধ্যান। তুমিই তো আমার শক্তি, আমার উদ্দীপনা, আমার ফিকে হয়ে যাওয়া বন্ধুহীন জীবনের একচিলতে আলোকবিন্দু।
সেই ধ্যানের পর যেন মনে হয় পৃথিবী অনেক সহজ জায়গা, অঙ্কগুলোও। আর তোমাকে কেমন যেন খুব কাছের লাগে—আমার মায়ের মতো কাছের মানুষ।
টিফিনের সময় একটা এগরোলের অর্ধেক টুকরো এসে থামল আমার কাছে। জমাট অন্ধকারের মতো বুকে তখনো অভিমান জমে আছে। আমি তোমার দিকে তাকাইনি একবারের জন্যও। অন্যদিকে তাকিয়ে খেয়ে নিলাম এগরোল। সেই অন্যদিকে তাকিয়েই বাটার টোস্টের দু-ফালি রুটি এগিয়ে দিলাম তোমার দিকে।
তুমি হয়তো জানো না, আমার রাগ বা অভিমানগুলো দীর্ঘস্থায়ী। অনেক সময় লাগে সেই আগুন নিভতে। অন্যদিকে তাকিয়ে তোমার দেওয়া টিফিন খাওয়ার ব্যাপারটা এভাবেই চলবে অনেক দিন—ততদিন তোমায় দেখব না আমি।
সেদিন ছুটির সময় আবার এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ এসে পড়ল আমার ব্যাগে। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম কারণ তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে আমার সামনে। আমি তাকাব না তোমার দিকে, অনেক দিন তাকাব না। তুমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে আমার ডেস্কের সামনে কিছু সময় ধরে, তারপর ধীর পায়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলে।
আর ভুল করিনি আমি। তুমি চলে যেতেই কাগজ খুলে পড়লাম। তাতে লেখা—'Sorry'। চোখ ভিজে এল। এই প্রথম কেউ আমার কাছে ক্ষমা চাইছে। এই ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা করার বিষয়টি একদম নতুন আমার কাছে। না আমি চেয়েছি, না আমার কাছে কেউ চেয়েছে। তাই বুঝতে পারছি না ক্ষমা করতে হয় কীভাবে। কারও কাছে যে এই অজানা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব, তাও সম্ভব নয়—কারণ আমি মুখচোরা ছেলে।
সেদিন ছুটির সময় আবার এক টুকরো ভাঁজ করা কাগজ এসে পড়ল আমার ব্যাগে। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম কারণ তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে আমার সামনে। আমি তাকাব না তোমার দিকে, অনেক দিন তাকাব না। তুমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলে আমার ডেস্কের সামনে কিছু সময় ধরে, তারপর ধীর পায়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলে।
আর ভুল করিনি আমি। তুমি চলে যেতেই কাগজ খুলে পড়লাম। তাতে লেখা—'Sorry'। চোখ ভিজে এল। এই প্রথম কেউ আমার কাছে ক্ষমা চাইছে। এই ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা করার বিষয়টি একদম নতুন আমার কাছে। না আমি চেয়েছি, না আমার কাছে কেউ চেয়েছে। তাই বুঝতে পারছি না ক্ষমা করতে হয় কীভাবে। কারও কাছে যে এই অজানা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব, তাও সম্ভব নয়—কারণ আমি মুখচোরা ছেলে।
একদিকে বুকের আনাচে-কানাচে সাজানো অভিমান, অন্যদিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজনকে ক্ষমা করার মতো অজানা এক অনুভূতি।
পরের দিন টিফিনের আগের পিরিয়ডে স্যার আসেননি। খুশিতে ক্লাসের বাকিরা মজা করছিল। মাঠে উইকেট পোতার কাজ শুরু হয়ে গেল। সবার মধ্যে একটা বেপরোয়া উদ্দীপনা। আমার ভালো লাগে না এসব। না কেউ পাত্তা দেয় আমায়, না কেউ বন্ধু হয়। সাজানো বাগানের মতো বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। ইস, কেউ যদি একবার ডাকত! ছুটে যেতাম আমি। কিন্তু জীবন বড় একগুঁয়ে; যা ভেবেছে কেড়ে নেবে, তা নেবেই। দেবে না ফেরত কোনোদিনও।
পরের দিন টিফিনের আগের পিরিয়ডে স্যার আসেননি। খুশিতে ক্লাসের বাকিরা মজা করছিল। মাঠে উইকেট পোতার কাজ শুরু হয়ে গেল। সবার মধ্যে একটা বেপরোয়া উদ্দীপনা। আমার ভালো লাগে না এসব। না কেউ পাত্তা দেয় আমায়, না কেউ বন্ধু হয়। সাজানো বাগানের মতো বুকে একরাশ কষ্ট নিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। ইস, কেউ যদি একবার ডাকত! ছুটে যেতাম আমি। কিন্তু জীবন বড় একগুঁয়ে; যা ভেবেছে কেড়ে নেবে, তা নেবেই। দেবে না ফেরত কোনোদিনও।
সেদিন সবাই হইহই করে ছুটে গিয়েছিল মাঠের দিকে। আকাশ কিন্তু মেঘলা ছিল। ক্লাসে আমি-তুমি ছাড়াও অপ্রয়োজনীয় কয়েকজন ছিল। আমি তখনো অভিমানে বুদ হয়ে আছি, তাকাই না তোমার দিকে। হুট করে চারদিক অন্ধকার করে নামল বৃষ্টি। এমনভাবে বৃষ্টি নামতে পারে, আমার জানা ছিল না। জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে ক্লাসে ঢুকছে। আমার পাশের ডেস্কে আধশোয়া হয়ে বসে ছিলে তুমি। হঠাৎ দেখলাম সোজা চলে গেলে জানালার পাশে। কুয়াশার মতো বৃষ্টি ঘিরে ধরেছে তোমায়। অস্পষ্ট এক অপূর্ব দৃশ্য! আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি তোমার দিকে। সেই অস্পষ্টতার মাঝে তুমি জানালার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে একদৃষ্টে তাকালে আমার দিকে। চোখ কেমন যেন তোমার—তাতে বৃষ্টির মতো ক্লান্ত কিছু জল। আবার চোখে চোখ আটকে গেল। তুমি যেন ডাকছ আমায়। তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো এগিয়ে গেলাম তোমার পাশে। সত্যি, ভয় লাগছে না আর। কেমন যেন এক শিহরণে শরীরের শিরা-উপশিরা বারবার কম্পিত হচ্ছে।
জানালার সামনে দাঁড়াতেই একঝাঁক বৃষ্টি আছড়ে পড়ল আমার গায়ে। পালাতে গেলাম কিন্তু পারলাম না—তুমি আমার হাত চেপে ধরেছ। তোমার দিকে তাকালাম। সত্যি ভয় লাগছে না আমার। তোমার চোখের কাজল বৃষ্টিতে ভিজে চোখ গড়িয়ে নেমে আসছে। কেমন ভাবে তাকিয়ে আছ যেন আমার দিকে! এত স্নেহ, এত ভালোবাসা, এত আন্তরিকতা, এত মাতৃসুলভ আকুলতা যে নীরবভাবে চোখে লেখা যেতে পারে, তা আমি জানতামই না। সেই চিত্ত-প্লাবিত আবেগকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। তোমার আঙুল চেপে বসে আছে আমার হাতে। এক মায়াময় আচ্ছাদন। জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টি পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আমাদের দুনিয়াকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। আমরা যেন সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে গেছি। তুমি স্থিরভাবে তাকিয়ে আছ আমার দিকে। আলগা কিন্তু এক অমোঘ বাঁধনে জাপটে ধরেছ আমায়। সেই বাঁধনে কী নির্মম শান্তি!
প্রথম কথা তুমিই বললে—"খুব অভিমান, না? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে আমার পাশে। আমার সাথে। আমার সামনে।"
জানালার সামনে দাঁড়াতেই একঝাঁক বৃষ্টি আছড়ে পড়ল আমার গায়ে। পালাতে গেলাম কিন্তু পারলাম না—তুমি আমার হাত চেপে ধরেছ। তোমার দিকে তাকালাম। সত্যি ভয় লাগছে না আমার। তোমার চোখের কাজল বৃষ্টিতে ভিজে চোখ গড়িয়ে নেমে আসছে। কেমন ভাবে তাকিয়ে আছ যেন আমার দিকে! এত স্নেহ, এত ভালোবাসা, এত আন্তরিকতা, এত মাতৃসুলভ আকুলতা যে নীরবভাবে চোখে লেখা যেতে পারে, তা আমি জানতামই না। সেই চিত্ত-প্লাবিত আবেগকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই।
আমি থমকে দাঁড়ালাম। তোমার আঙুল চেপে বসে আছে আমার হাতে। এক মায়াময় আচ্ছাদন। জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টি পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে আমাদের দুনিয়াকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। আমরা যেন সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে গেছি। তুমি স্থিরভাবে তাকিয়ে আছ আমার দিকে। আলগা কিন্তু এক অমোঘ বাঁধনে জাপটে ধরেছ আমায়। সেই বাঁধনে কী নির্মম শান্তি!
প্রথম কথা তুমিই বললে—"খুব অভিমান, না? চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে আমার পাশে। আমার সাথে। আমার সামনে।"
সময় অনেক এগিয়ে গেছে। আমি এখনো দাঁড়িয়ে থাকি তোমার সামনে। তুমি ছবি হয়ে দেখো আমায়। জীবনের পরম পাওয়াগুলো সব সময় হারিয়ে গিয়েই তার সম্মান পায়। তুমিও পেয়েছ আমার নিবিড় সম্মান, আমার বুকফাটা আর্তনাদকারী ভালোবাসা। এখন বড় হয়েছি। আমাদের স্বপ্নের মতো সেই মেয়েকে বুকে আগলে বড় করে তুলছি একাকী। কিন্তু কষ্ট কখন হয় জানো? যখন ভাবি—তুমি আমার বুকে মাথা রেখে আমাদের মেয়েকে নিয়ে কত কী স্বপ্ন সাজাতে! আমি তোমার চুলে হাত বুলিয়ে দিতাম, আর তুমি সেই আবেগে মিশে যেতে আমার বুকে।
সব ঠিকই হলো। আমাদের মেয়ে হলো। কিন্তু প্রসবের সময় যে জ্ঞান হারালে তুমি, তা আর ফিরে এল না। শেষবারের মতো আমি তোমাকে দেখেছিলাম, কারণ আমি তোমার সঙ্গেই ছিলাম। তুমি তোমার আঙুল দিয়ে আমায় জাপটে ধরেছিলে। একটি নতুন প্রাণ জন্ম নিল, কিন্তু মায়ের হাতের সেই আঙুলের বাঁধন শিথিল হয়ে গেল চিরতরে।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম। নীরব হয়ে যাওয়া তোমাকে দেখছিলাম। কী অপরিসীম কান্না আসছিল আমার! কিন্তু আমি কাঁদিনি। আমি কারও সামনে কাঁদতে পারি না। কাউকে নিজের বুকচেরা যন্ত্রণার কথা বলতেও পারি না। শক্তভাবে সেই অবর্ণনীয় ব্যথাগুলো বুকের অনেক গভীরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিই।
মুখচোরা ছেলে কি না!
সব ঠিকই হলো। আমাদের মেয়ে হলো। কিন্তু প্রসবের সময় যে জ্ঞান হারালে তুমি, তা আর ফিরে এল না। শেষবারের মতো আমি তোমাকে দেখেছিলাম, কারণ আমি তোমার সঙ্গেই ছিলাম। তুমি তোমার আঙুল দিয়ে আমায় জাপটে ধরেছিলে। একটি নতুন প্রাণ জন্ম নিল, কিন্তু মায়ের হাতের সেই আঙুলের বাঁধন শিথিল হয়ে গেল চিরতরে।
আমি বুঝে গিয়েছিলাম। নীরব হয়ে যাওয়া তোমাকে দেখছিলাম। কী অপরিসীম কান্না আসছিল আমার! কিন্তু আমি কাঁদিনি। আমি কারও সামনে কাঁদতে পারি না। কাউকে নিজের বুকচেরা যন্ত্রণার কথা বলতেও পারি না। শক্তভাবে সেই অবর্ণনীয় ব্যথাগুলো বুকের অনেক গভীরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিই।
মুখচোরা ছেলে কি না!

সত্যি চোখে জল এনে দেওয়া কাহিনী। দুঃখ কতটা কাব্যিক হতে পারে।
ReplyDelete